পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের দুর্গম এলাকায় মঙ্গলবার (১১ মার্চ) জাফর এক্সপ্রেসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ৪০০-র বেশি যাত্রী জিম্মি হন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নিরাপত্তা কর্মীও ছিলেন। জিম্মিদের উদ্ধারে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচালিত অভিযানে ১০৪ জন যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩১ নারী ও ১৫ শিশু রয়েছে। বাকি যাত্রীদের উদ্ধারে অভিযান চলছে। খবর ডন।

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করেছে, বোলান পাসের ধাধার এলাকায় অভিযান চালিয়ে অন্তত ১৬ হামলাকারীকে হত্যা করা হয়েছে। তবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা যায়নি। অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ট্রেনচালকও রয়েছেন।

নিষিদ্ধ ঘোষিত বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। তারা দাবি করেছে, কিছু নারী ও শিশুকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সশস্ত্র সংগঠনটি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রত্যন্ত সিবি জেলায় ট্রেনটিতে হামলা চালানোর আগে রেললাইনে বোমা মেরেছে তারা। ট্রেনটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিএলএ বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাসহ ট্রেনের যাত্রীদের একটি বড় অংশকে তারা জিম্মি করছে। তাদের উদ্ধারের কোনো প্রচেষ্টা নেয়া হলে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।

মঙ্গলবার সকাল ৯টায় কোয়েটা থেকে পেশোয়ারের উদ্দেশে ৪৫০ যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি ছেড়ে যায়। দুপুর ১টার দিকে মুশকাফ টানেলের কাছে রকেট ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ট্রেন থামিয়ে দেয়া হয়। এরপর হামলাকারীরা যাত্রীদের পরিচয় যাচাই করে তাদের জিম্মি করে পাহাড়ে নিয়ে যায়।

এর আগে বেলুচিস্তান প্রাদেশিক সরকারের মুখপাত্র শহীদ রিন্দ বলেন, ট্রেনটিতে ব্যাপক গোলাগুলি হয়েছে। ট্রেনটি যে এলাকায় আটকে আছে, সেখানে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল।

কোয়েটার রেলওয়ে কন্ট্রোলার মুহাম্মদ কাশিফ বিবিসিকে জানিয়েছেন, ট্রেনে ৪০০-৫০০ জন যাত্রীর টিকিট বুক করা ছিল। তবে ঠিক কতজন যাত্রী ভ্রমণ করছিলেন তার সঠিক তথ্য নেই। তিনি বলেন, সশস্ত্র ব্যক্তিরা ট্রেনটি ৮ নম্বর টানেলের কাছে থামিয়েছিল।

বেলুচিস্তান প্রাদেশিক সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সিবি হাসপাতালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স ও অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী পাঠানো হয়েছে। তবে সরকারের মুখপাত্র শহীদ রিন্দ জানান, পাহাড়ি পাথুরে এলাকার কারণে কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য রেলওয়ে বিভাগ ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী ট্রেন পাঠিয়েছে। বিবৃতিতে জনসাধারণকে শান্ত থাকতে এবং গুজবে কান না দিতে অনুরোধ করো হয়েছে।

পেশোয়ারের রেলস্টেশনের ইনচার্জ তারিক মাহমুদ বলেন, জাফর এক্সপ্রেস কোয়েটা থেকে ছেড়ে চারটি প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল পেরিয়ে ৩৪ ঘণ্টায় পেশোয়ার পৌঁছায়। পাঞ্জাবের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিকাংশ যাত্রী কোয়েটা থেকে ট্রেন ছাড়ার পর এতে ওঠেন।’ এদিকে কোয়েটার সিভিল হাসপাতালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। কোয়েটা স্বাস্থ্য বিভাগের মুখপাত্র ডা. ওয়াসিম বেগ জানান, সমস্ত বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, স্টাফ নার্স এবং প্যারামেডিকেল কর্মীদের হাসপাতালে ডাকা হয়েছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, নিরীহ যাত্রীদের ওপর গুলি চালানো পশুদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না।’ তিনি গুলিবিদ্ধ আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।

প্রসঙ্গত, বেলুচিস্তানে কয়েক দশক ধরে যে বিদ্রোহ চলছে, তাতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী খনিজ সম্পদে ভরপুর ওই অঞ্চলে নিয়মিতই সরকার, সেনাবাহিনী ও চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। কেন্দ্রীয় সরকার বেলুচিস্তানের গ্যাস ও খনিজ সম্পদে অন্যায্য শোষণ চালাচ্ছে দাবি করা বিএলএর আকাঙ্ক্ষা স্বাধীন বেলুচিস্তান। দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ওই অঞ্চলে যারা লড়াই করছে, তাদের মধ্যে বিএলএই সবচেয়ে বড় সশস্ত্র সংগঠন।