মিয়ানমারের মান্দালয়ের কাছে সাগাইং অঞ্চলে শুক্রবার (২৮ মার্চ) ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে বিপর্যয় নেমে এসেছে মিয়ানমারে। দেশটিতে অন্তত ১৪৪ জন নিহত হয়েছে বলে জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং জানিয়েছেন। দেশটিতে সহস্রাধিক প্রাণহানির আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মিয়ানমারের প্রতিবেশী থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককেও। দুই দেশেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। খবর রয়টার্স।

দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত মিয়ানমার। তবে, সাগাইং অঞ্চলে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে বিরল।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জোয়ানা ফোর ওয়াকার বলেন, ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশীয় প্লেটের সীমানা মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত। এই প্লেটগুলো ভিন্ন ভিন্ন গতিতে পাশ কাটিয়ে চলে, যা ‘স্ট্রাইক-স্লিপ’ বা, পার্শ্বীয় ঘর্ষণের ফলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে। সাধারণত এই ধরনের ভূমিকম্প সাবডাকশন জোনের ভূমিকম্পের চেয়ে কম শক্তিশালী হয়। সাবডাকশন জোনের ভূমিকম্পে একটি প্লেট অন্যটির নিচে সরে যায় এবং এ ধরনের ভূমিকম্পের মাত্রা ৭ থেকে ৮ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যেমনটি হয়েছিল সুমাত্রায়।

সাগাইং অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে। ২০১২ সালে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার এক ভূমিকম্পে অন্তত ২৬ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছিলেন।

কিন্তু শুক্রবারের ভূমিকম্প গত ৭৫ বছরের মধ্যে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প বলে মনে করছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ বিল ম্যাকগাইয়ার।

usgs

মিয়ানমারের মান্দালয়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত সাগাইং ফল্টের অবস্থান দেখানো হয়েছে মানচিত্রে। ছবি: ইউএসজিএস

এদিকে, ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার গবেষক রজার মুসন জানান, ভূমিকম্পের গভীরতা মাত্র ১০ কিলোমিটার (৬ দশমিক ২ মাইল) হওয়ার কারণে এর প্রভাব মারাত্মক হয়েছে। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল যদি অগভীর হয়, তবে কম্পনের শক্তি ভূমি পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায় না। ফলে ভবনগুলো প্রচণ্ড কম্পনের শিকার হয়।

তিনি আরো বলেন, শুধু ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টারের দিকে নজর দিলেই চলবে না, কারণ ভূমিকম্পের তরঙ্গ পুরো ফাটল রেখা থেকে বিকিরণ হয়।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ মিয়ানমারের জিডিপির ৭০ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে।

রজার মুসন বলেন, ক্ষয়ক্ষতির এ ধরনের পূর্বাভাস অতীতের ভূমিকম্পের তথ্য, মিয়ানমারের অবস্থান এবং দেশটির ভূমিকম্প প্রস্তুতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

সাগাইং অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের ঘটনা বিরল হওয়ায় সেখানে অবকাঠামো ভূমিকম্প সহনশীলভাবে নির্মিত হয়নি। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মুসন বলেন, এই অঞ্চলে শেষ বড় ভূমিকম্প হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। তাই বেশিরভাগ ভবন এত শক্তিশালী ভূমিকম্প মোকাবেলার জন্য তৈরি নয়। মিয়ানমারের বেশিরভাগ ভূমিকম্প দেশটির পশ্চিম অংশে হয়। কিন্তু এবারের ভূমিকম্প দেশটির কেন্দ্রে ঘটেছে।