পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) হাজার হাজার সমর্থক গত সোমবার (২৫ নভেম্বর) রাতে ইসলামাবাদে পৌঁছায়। তখন ইমরানের স্ত্রী বুশরা বিবি ইমরান খানের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকার জন্য সমর্থকদের প্রতিও আহ্বান জানান। তবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান প্রতিবাদী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। প্রতিবাদকারী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মধ্যে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
রাজধানী ইসলামাবাদের রেড জোনের কাছে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বুশরা বিবি এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী আলী আমিন গান্ডাপুর অন্ধকারে পালিয়ে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে ফিরে যান। নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে। বুধবার সকালে, পিটিআই এক বিবৃতিতে প্রতিবাদ প্রত্যাহারের কথা জানায়।
বুশরা বিবি এবং গান্ডাপুরের আকস্মিক প্রস্থানের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আহমেদ ইজাজ। তিনি বলেন, তাদের পদক্ষেপ দলের মধ্যে বিভাজন গভীর করবে। ডি-চকে তারা যেভাবে সমর্থকদের ছেড়ে গেছে তা দলের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণে সমস্যা তৈরি করবে।
পিটিআই কনভয়গুলো আদালতের আদেশ অমান্য করে খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে ইসলামাবাদে প্রবেশ করে তিনটি দাবি আদায়ের জন্য— ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা, ইমরান খানসহ রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং সাংবিধানিক সংশোধনী বাতিল; যা বিচারক নিয়োগের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
প্রতিবাদকারীদের ফিরে যাওয়া প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, চাপের মধ্যে ছিল পিটিআইয়ের নেতৃত্ব। দলের কোনো দাবিই পূরণ হয়নি এবং কীভাবে তারা পুনরায় সংগঠিত হবে তা পরিষ্কার ছিল না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাইঘাম খান বলেন, এই প্রতিবাদকে পিটিআইয়ের ‘চূড়ান্ত লড়াই’ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু এভাবে ভেঙে পড়া তাদের রাজনৈতিক কৌশলের জন্য বড় আঘাত।
পিটিআই বলেছে, তাদের আটজন সমর্থক নিহত হয়েছে। অন্যদিকে সরকার তাজা গোলাবারুদ ব্যবহারের কথা অস্বীকার করে জানায়, কোনো প্রতিবাদকারী মারা যায়নি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার পিটিআই কনভয়ের সঙ্গে ‘হিট অ্যান্ড রান’-এর ঘটনায় তিনজন রেঞ্জার নিহত হয়েছেন। আর দলের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন পুলিশ কনস্টেবল মারা গেছেন।
গত চার মাসের মাঝে এটি ছিল পিটিআই-এর চতুর্থ প্রতিবাদ। অক্টোবরেও একটি সমাবেশ অকালেই শেষ হয়ে যায়।
বুধবার দুপুরে, গান্ডাপুর খাইবার পাখতুনখোয়ার মানসেহরা শহরে এক সংবাদ সম্মেলনে পিটিআই কর্মীদের ওপর সরকারের দমন-পীড়নের নিন্দা জানান। তিনি ইঙ্গিত দেন, পিটিআই তাদের দাবি পূরণে চাপ দিতে থাকবে।
২০২২ সালের এপ্রিল মাসে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানের সরকার অপসারণ হওয়ার পর থেকেই পিটিআই প্রতিবাদমূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পিটিআই প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসন জিতলেও দলটি সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয় এবং তাদের ম্যান্ডেট চুরি হয়েছে বলে দাবি করে।
ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে বুশরা বিবি ৯ মাস কারাগারে ছিলেন, পরে অক্টোবরে জামিন পেয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মোহসিন নাকভি বুশরা বিবিকে ইসলামাবাদের অস্থিরতা সংগঠনের জন্য দায়ী করেছেন।
পিটিআই নেতা সৈয়দ জুলফি বুখারি দলের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছেন, দলটি হতাহতের পরিস্থিতি মোকাবিলায় মনোযোগ দিচ্ছে।
কিন্তু লাহোরভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেনজির শাহ বলেছেন, ইমরান খানের মুক্তির জন্য আরেকটি বড় মাপের প্রতিবাদ শুরু করা পিটিআইয়ের জন্য এই মুহূর্তে অসম্ভব। তিনি বলেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পিটিআইকে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং আন্দোলনের সঙ্গে জোট গঠন করা হতে পারে একটি সম্ভাব্য পথ। সামাজিক বা মানবাধিকার বিষয়ক যৌথ প্রতিবাদ জাতীয় সমর্থন জোগাতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, পিটিআই-এর সাম্প্রতিক প্রতিবাদে ব্যর্থতা তাদের নেতৃত্বের অভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বিশ্লেষক তালাত হুসেন বলেছেন, দলের সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণার ওপর নির্ভরতা বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যর্থ হয়েছে। পিটিআই শিখেছে যে, রাজনীতিতে অনলাইনের বয়ানের চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, এ সপ্তাহের ঘটনাগুলো সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার উপরেও ছায়া ফেলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেনজির শাহ বলেন, ভবিষ্যতের প্রতিবাদ রোধ করার জন্য সরকার শক্তি প্রয়োগ করেছে। তবে এই কঠোর পন্থা উল্টো ফল দিতে পারে এবং এ ঘটনা সরকারের ব্যর্থতা এবং সংলাপ পরিচালনার অক্ষমতাকে প্রকাশ করে।
ইসলামাবাদ ভিত্তিক বিশ্লেষক জাইঘাম খান আন্দোলন দমনে সরকারের প্রতিক্রিয়ায় বিস্মিত হননি। ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এটি সবচেয়ে অজনপ্রিয় সরকার। তাই প্রতিবাদের যে কোনো চেষ্টাকে তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে এবং কঠোরভাবে দমন করছে।










