সব স্বপ্ন ভেঙে গেল— কথাটা বলছিলেন আফগান কিশোরী আমিনা। তার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়া। ২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবান ফিরে আসার পর ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ হয়। চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বহাল এ নিষেধাজ্ঞা। খবর বিবিসি।

আমিনা এখন ১৫। ছোটবেলায় হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে অস্ত্রোপচার করেছিলেন তিনি। যে নারী সার্জন তার অস্ত্রোপচার করেছিলেন তার অনুপ্রেরণায় ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন আমিনা। কিন্তু তালেবানের নিষেধাজ্ঞায় তার সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ১০ লাখের বেশি মেয়ে শিক্ষার সুযোগ হারিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক মেয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হচ্ছে।

কাবুলের আল-হাদিস মাদ্রাসা এমনই একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে আমিনার ভাই হামিদ মেয়েদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। হামিদ বলেন, স্কুল বন্ধ হওয়ার পর আমার বোন খুব ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু মাদ্রাসায় পড়ার সুযোগ পেয়ে সে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।

তালেবান সরকার শিক্ষা সংস্কারের নামে মগজধোলাই করছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তালেবান বলছে, তারা ইসলামিক কারিকুলাম চালু না করা পর্যন্ত মেয়েদের স্কুল খুলবে না। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, মাদ্রাসাগুলো তালেবানের রাজনৈতিক মতাদর্শ শেখানোর জায়গা হয়ে ওঠছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত আফগান মানবাধিকার কেন্দ্রের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, অনেক মাদ্রাসার পাঠ্যবইতে চরমপন্থী মতাদর্শ যোগ করা হয়েছে। এতে তালেবানের সামরিক কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়া হয়েছে, নারী-পুরুষের মেলামেশা সেখানে নিষিদ্ধ এবং জোরপূর্বক হিজাব পরার বিধানও রয়েছে।

কাবুলের আরেকটি মাদ্রাসা শেখ আব্দুল কাদির জিলানি মাদ্রাসা— যেখানে প্রায় ১,৮০০ মেয়ে ও নারী পড়াশোনা করে। এখানে শিক্ষার্থীদের বয়স ৫ থেকে ৪৫ পর্যন্ত। এখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, ভাষা ও ইতিহাসও পড়ানো হয়। তবে দেখা গেছে, ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণকারীর সংখ্যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি।

মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ২০ বছর বয়সী হাদিয়া বলেন, তিনি বিজ্ঞান ভালোবাসেন। এটা চারপাশের জগতকে বোঝার চাবিকাঠি। কিন্তু তিনি এখন শুধু কোরআন শিক্ষা দেন, কারণ বিজ্ঞান নিয়ে পড়ানোর সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, ১৩ বছর বয়সী তাওকা বলেন, আমি ধর্মীয় বিষয় পড়তে পছন্দ করি। আমি চাই ধর্ম প্রচারক হয়ে ইসলামকে ছড়িয়ে দিতে।

তবে আল-হাদিস মাদ্রাসার শিক্ষক ২০ বছর বয়সী সাফিয়া মাদ্রাসাগুলোকে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প হিসেবে দেখেন না। তিনি বলেন, প্রথাগত শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না।

জাতিসংঘের আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষ দূত রিচার্ড বেনেট সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি চরমপন্থী ভাবধারা বাড়াতে পারে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য তৈরি করতে পারে হুমকি।

তবে তালেবান সরকারের দাবি, আফগানিস্তানে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় পড়ছে এবং সরকার মেয়েদের স্কুল খুলতে চায়, তবে শর্তসাপেক্ষে। কিন্তু বাস্তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি।

অনেক বাধার পরেও আমিনা এখনো আশাবাদী। তিনি বলেন, একদিন তালেবান মেয়েদের স্কুলে ফেরার অনুমতি দেবে। তখন আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করে হার্ট সার্জন হবো।