পাহাড়, ঝিরি-ছড়া, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রামকে বলা হয় দেশের ‘পরিবেশের প্রাণকেন্দ্রীয় অঞ্চল’। ঝিরি ও ঝরনার পানি, আদি বনভূমি, বাঁশবন এবং নানা ধরনের ফসলভিত্তিক কৃষি এখানে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এ অঞ্চল এখন নানা ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি। বনভূমি উজাড়, ঝিরি-ছড়া শুকিয়ে যাওয়া, অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প, অতিমাত্রায় প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, সড়ক নির্মাণ, পাহাড় কেটে বসতি ও বাণিজ্যিক কৃষি সম্প্রসারণ—এসব কার্যক্রমে এ অঞ্চলের নাজুক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। ফলাফল দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও খাদ্য সংকট।

এ সংকট কেবল পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে ব্যাহত করছে। পানির সংকট গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তুলেছে। কৃষিজ উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। একসময়ের সবুজ পাহাড় এখন মরুময়তার আভাস দিচ্ছে। আবার অপরিকল্পিত উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে মানবজীবন ও সম্পদকে অরক্ষিত করে তুলছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ ও প্রকৃতির সংকটগুলোর মধ্যে বন উজাড় হয়ে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অব্যবস্থাপনা অন্যতম। এ অঞ্চল একসময় ছিল সমৃদ্ধ আদি বনভূমি, যেখানে ছিল শত শত প্রজাতির বৃক্ষ, ঔষধি গাছ এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এ বনভূমি ছিল পাহাড়ের জলবায়ু ও মাটির ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সেগুন ও ইউক্যালিপটাস জাতীয় গাছ লাগানো, পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, কচু, কাসাভা ও আনারস চাষ এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকনির্ভর কৃষির মাত্রা বাড়ায় প্রাকৃতিক বন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। বন উজাড়ের ফলে মাটির উর্বরতা কমছে। ঢাল ভাঙছে পাহাড়ের। শুকিয়ে যাচ্ছে ঝিরি-ছড়া, যা পানির প্রাপ্যতাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

পাহাড়ি এলাকার মানুষ একসময় সহজেই ঝিরি, ঝরনা ও বাঁশঝাড়ের নিম্নাঞ্চল থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারত। কিন্তু বন উজাড় ও প্রাকৃতিক জলাশয় নষ্ট হওয়ায় এসব উৎস ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। বন না থাকায় বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হতে পারছে না। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমছে। এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো কৃষিজমিগুলোর একচেটিয়া দখল নিয়েছে তামাক চাষাবাদ।

কয়েক বছর ধরে এখানকার খাদ্য সংকটে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে ‘ইঁদুর–বন্যা’। বাঁশে ফুল ফোটার পর ইঁদুরের প্রজনন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং তারা ফসল ও সংরক্ষিত খাদ্য খেয়ে ফেলে। এটি প্রত্যক্ষভাবেই পাহাড়ের জুমিয়া কৃষকদের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এখানে উল্লেখ করা ভালো, সাজেক ইউনিয়নে বাঁশের ফুল ফোটার পর ইঁদুরের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, যা কৃষিজমিতে আক্রমণ করে স্থানীয় জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে। ২০০৭ ও ২০১৬ সালে এই ইঁদুর বন্যার ফলে পাঁচ হাজারের অধিক জুমিয়ার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

অপরিকল্পিত কার্যক্রমও পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় একটি কারণ। পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলা, সংবেদনশীল রুট দিয়ে রাস্তা নির্মাণ এবং ছড়া-ঝিরি ভরাটের কারণে স্থানীয় নদীগুলোর নাব্যতা কমছে, ফলে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। বন না থাকায় মাটি বৃষ্টির পানিতে ভেসে গিয়ে নিচের গ্রামে একসঙ্গে প্রবাহিত হয়ে ঘরবাড়ি, ফসল ও গবাদিপশু ধ্বংস করছে।

পার্বত্য অঞ্চলে একসময় আদি বন, বাঁশ, অর্কিডসহ অগণিত উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র‍্য দেখা যেত। কিন্তু কাপ্তাই বাঁধ, বন উজাড়, বাণিজ্যিকভাবে একক প্রজাতির চাষাবাদ (মনোকালচার), রাসায়নিক সার-ওষুধের ব্যবহার এবং বিদেশী আগ্রাসী গাছ যেমন আসামগাছ, ল্যান্টানা ও কচুরিপানা এখন স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকে বিঘ্নিত করছে। সেগুন ও ইউক্যালিপটাসের ঘন মনোকালচার অন্যান্য বৃক্ষ ও উদ্ভিদ জন্মের সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং ভূমিক্ষয়ের আশঙ্কাও বাড়ছে।

খাদ্য ও পানি সংকটের কারণে মানুষের জীবনধারা, কৃষি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন উজাড়, বাণিজ্যিক ফসল চাষ, জলবায়ু পরিবর্তন, আগ্রাসী প্রজাতির আবাদ এবং অপরিকল্পিত কার্যক্রম একত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশ বিপর্যয়ের বিস্তৃত চিত্র সৃষ্টি করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এ প্রকৃতি ও পরিবেশের অবক্ষয় রোধে কিংবা এসব বিপর্যয় থেকে উত্তরণে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পরিবেশ ও বন সংরক্ষণের প্রক্রিয়ায় সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও উন্নয়ন সংস্থার অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বনভূমি রক্ষার পাশাপাশি ঝিরি ও ঝরনার পানি সংরক্ষণের জন্য উৎসগুলোয় বাঁশ ও আদি বা স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। অবৈধ বন উজাড় বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য। বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

জুম চাষকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না করে আধুনিক ও টেকসই পদ্ধতিতে এ প্রাচীন চাষপদ্ধতিকে কীভাবে পরিবেশবান্ধব করে তোলা যায়, তার জন্য জুমচাষীদের সঙ্গে নিয়ে সরকার বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারে। একই সঙ্গে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের প্রবণতা কমিয়ে স্থানীয় জৈব চাষপদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারলে পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে এবং খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

পাহাড়ি অঞ্চলে পানির সংকট মোকাবেলায় গ্র‍্যাভিটি-ফ্লো সিস্টেম, রিং ওয়েল এবং সৌরশক্তিচালিত পানি আহরণ ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তিগত উদ্যোগকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। পাশাপাশি ঝিরি ও ছড়া সংরক্ষণ এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কম খরচে পানির স্থায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

জীববৈচিত্র‍্য সংরক্ষণের জন্য একজাতীয় বাণিজ্যিক গাছের পরিবর্তে বাঁশ, ফলদ ও ঔষধি গাছ রোপণে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এতে পাখি ও প্রাণীর জন্য আশ্রয় নিশ্চিত হবে এবং পানির প্রবাহ টিকে থাকবে। পরিবেশ সংরক্ষণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান, যেমন ঝিরি ব্যবস্থাপনা ও জুম চাষের পুরনো পরীক্ষিত নিয়মগুলো কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। শতাব্দীর প্রাচীন সামাজিকভাবে স্থানীয় বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রামীণ সাধারণ বন বা ভিলেজ কমন ফরেস্ট (ভিসিএফ) সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে স্থানীয় মানুষের সংগঠন ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি ভিসিএফগুলোকে সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে, যাতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র‍্য সুরক্ষিত থাকে।

লেখক: গবেষক এবং নির্বাহী পরিচালক, জাবারাং কল্যাণ সমিতি