চাঁদের দক্ষিণ মেরুর গহ্বরে জমে থাকা বরফের সন্ধানে আগামী বছর একটি উড়ন্ত রোবট পাঠানোর পরিকল্পনা করছে চীন। এই মিশন সফল হলে তা চন্দ্রাভিযানের গতিপথ বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। ২০২৬ সালে চ্যাং'ই-৭ মিশনের অংশ হিসেবে এই রোবটটি চাঁদের অন্ধকার পিঠে পাঠানো হবে, যা চীনের ২০৩০ সালের মধ্যে মনুষ্যবাহী চন্দ্রযান পাঠানোর লক্ষ্যের দিকে এক ধাপ এগিয়ে দেবে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি'র প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদের মেরু অঞ্চলে গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তুতিও জোরেশোরে এগিয়ে নিচ্ছে বেইজিং।

চাঁদে পানির অস্তিত্ব নতুন কিছু নয়। ২০২২ সালে চীনের চ্যাং'ই-৫ মিশন চাঁদের মাটিতে পানির অণু শনাক্ত করে। নাসা ও ভারতের মহাকাশযানও পূর্বে চন্দ্রপৃষ্ঠে হাইড্রক্সিল ও পানির সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর গভীর গহ্বরে সংরক্ষিত বরফই মানুষের জন্য ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।

চীনের লুনার এক্সপ্লোরেশন প্রজেক্টের প্রধান ডিজাইনার উ ওয়েইরেন ব্যাখ্যা করেন, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অত্যন্ত গভীর কিছু গুহা রয়েছে, যেখানে বরফ থাকার সম্ভাবনা প্রবল। উড়ন্ত রোবটটি অবতরণের পর এক বা দুটি গুহার সরেজমিন পরিদর্শন করবে।

এই বরফ চাঁদে মানব বসতি বা রকেটের জ্বালানি তৈরির কাজে লাগানো গেলে মহাকাশ মিশনের ব্যয় কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি, এই আবিষ্কার মহাকাশে প্রাণের সম্ভাবনাও উসকে দিতে পারে। তবে নাসার সাবেক বিজ্ঞানী ক্যাসি হনি বলেছেন, চাঁদের পানি এখনই ফসল ফলানো বা পানীয় জলের উৎস হওয়ার যোগ্য নয়। এর রাসায়নিক গঠন ও পরিমাণ নিয়ে বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন।

চ্যাং'ই-৭ মিশনে একটি অরবিটার, ল্যান্ডার, রোভার ও উড়ন্ত রোবট পাঠানো হবে। এই রোবটটি মানুষের মতো করেই পা ভাঁজ করা এবং উঁচু থেকে লাফ দিয়ে অবতরণ করতে পারে। রোবটটি সূর্যালোকিত এলাকা থেকে অন্ধকার গহ্বরে কমপক্ষে তিনবার লাফ দিয়ে বরফের অবস্থান, পরিমাণ ও বণ্টন বিশ্লেষণ করবে। চীনের মহাকাশ বিজ্ঞানী তাং ইউহুয়া সতর্ক করেছেন, চাঁদের মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রা মাইনাস ২৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে। এমন চরম পরিবেশে রোবটের টিকে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

চাঁদের অক্ষীয় ঢালের কারণে মেরুর গহ্বরগুলোতে সূর্যের আলো কখনো পৌঁছায় না। ফলে, এই অঞ্চলের বরফ কোটি কোটি বছর ধরে অক্ষত থাকতে পারে। গ্লোবাল স্পেস এক্সপ্লোরেশন কনফারেন্সে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ৬০০ কোটি টন বরফ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

মহাকাশ বিশেষজ্ঞ ড. লি মিং বলেন, চাঁদের বরফ শুধু পানির উৎসই নয় বরং, এই বরফকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিভক্ত করে রকেটের জ্বালানিও তৈরি করা যাবে। এটি চন্দ্রপৃষ্ঠকে 'স্পেস স্টেশন'-এর মতো জ্বালানি সাপ্লাই পয়েন্টে পরিণত করবে।

চীনের এই উদ্যোগকে মার্কিন-চীন মহাকাশ প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের অংশ হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকরা। নাসা ২০২৫ সালে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অভিযানের পরিকল্পনা করেছে। ভারত, জাপান ও রাশিয়ার সঙ্গেও চুক্তি করেছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, রাশিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গে মহাকাশ জোট গড়ে তুলছে চীন।

সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ড. কোহ চিন ইয়িওং সতর্ক করেন, চাঁদের সম্পদ নিয়ে সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। চীন যদি সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলে, তা মার্কিন আধিপত্যের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

চীনের এই মিশন নিয়ে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ে উৎসাহ থাকলেও সমালোচনাও কম নয়। পরিবেশবিদরা বলছেন, চাঁদের বরফ উত্তোলন এর নাজুক বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংস করতে পারে। পাশাপাশি, চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কিছু বিশেষজ্ঞ। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক ড. সারাহ নিকোলসন বলেন, উড়ন্ত রোবটের নমুনা সংগ্রহের সক্ষমতা প্রমাণিত হয়নি। চাঁদের মেরু অঞ্চলের চরম তাপমাত্রায় ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

চাঁদের বরফ মানব সভ্যতাকে মহাকাশে প্রসারিত করার স্বপ্ন দেখালেও এর নৈতিক ও আইনি জটিলতা রয়েছে। ১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি অনুযায়ী, চাঁদসহ মহাজাগতিক বস্তু কোনো দেশের মালিকানাধীন নয়। কিন্তু সম্পদ উত্তোলনের স্পষ্ট নিয়ম না থাকায় দ্বন্দ্বের আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: সিএনএন