তিনি বলেছিলেন— 'Don't become a philosopher before you become rich'. পর্দায় তিনি কখনো প্রেমিক, কখনো স্বপ্নবাজ, কখনো বা দুর্দমনীয় যোদ্ধা। তার দুহাত প্রসারিত হলেই যেন থমকে যায় সময়, উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে অসংখ্য হৃদয়। কোটি মানুষের ভালোবাসা, খ্যাতি, অর্থ, রাজকীয় জীবন কী নেই তার! জীবনে সবকিছু থাকার পরও এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা বয়ে চলেন তিনি। আর কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রেমের সংজ্ঞা নতুন করে তৈরি করে চলেছেন প্রতিনিয়ত, তিনি শাহরুখ খান। আজ ৬১ বছরে পা দিলেন এই অভিনেতা।

১৯৯৭ সালে সিমি গরওয়ালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শাহরুখ খান নিজের জীবনের এমন এক অনুভূতির কথা বলেছিলেন, যা তার ঝলমলে তারকাখ্যাতির সঙ্গে সহজে মেলানো যায় না। তখন তিনি বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ। হাতে অর্থ, পাশে ভালোবাসার মানুষ, জীবনে প্রতিষ্ঠা, আর চারপাশে অসংখ্য অনুরাগী। তিনি বলেছিলেন, এই সবকিছুর ভেতরে তিনি অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন। এই একাকিত্বের জন্য তার চারপাশের মানুষদের দায়ী করা যায় না। বরং অতীতের কিছু স্মৃতি, কিছু হারানোর বেদনা তাকে এমন এক শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা সব সময় সহজ হয় না। নিজের ভাবনা থেকে পালিয়ে থাকার চেষ্টার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

শৈশবে বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ খানকে হারান শাহরুখ। কয়েক বছর পর পৃথিবী ছেড়ে চলে যান মা লতিফ ফাতিমাও। পরপর দুটি মৃত্যু যেন তার পরিচিত পৃথিবীটাকেই বদলে দিয়েছিল। বড় বোন শেহনাজের সঙ্গে শিখতে হয়েছিল, সবচেয়ে আপন মানুষদের অনুপস্থিতি নিয়েও কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। বাবা-মাকে হারানোর সেই অভিজ্ঞতা কিং খানের জীবনের গভীরতম ক্ষতগুলোর একটি হয়ে আছে।

২০০৪ সালে বিবিসির প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য ইনার ওয়ার্ল্ড অব শাহরুখ খান’-এ মা-বাবাকে নিয়ে কথা বলেন তিনি, সেখানে স্মৃতির এক কোমল অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছিল। মায়ের সঙ্গে টেলিভিশনে হিন্দি সিনেমা দেখা, অসুস্থ মায়ের পা টিপে দেয়া, বাবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক— ছোট ছোট এসব স্মৃতিই যেন অভিনেতার কাছে অমূল্য সম্পদ। বাবাকে মনে পড়লে শুধু তার শাসন কিংবা উপদেশের কথা মনে পড়ে না, মনে পড়ে একজন বন্ধুর কথা, যার সান্নিধ্যটুকু আর কখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

shahrukh_khan_family

পরিবারের সঙ্গে শাহরুখ খান

সম্ভবত এখানেই শাহরুখ খানের জীবনের সবচেয়ে মানবিক অধ্যায়গুলোর একটি লুকিয়ে আছে। যিনি নিজের শৈশবে বাবা-মায়ের সান্নিধ্য হারিয়েছেন, তার কাছে নিজের সন্তানদের পাশে থাকা নিছক দায়িত্ব নয়, বরং এক গভীর অঙ্গীকার। ডেভিড লেটারম্যানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সন্তানদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, সন্তানদের জীবনে উপস্থিত থাকতে চান। তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে চান, পড়াশোনায় পাশে থাকতে চান, তাদের ছোট ছোট সমস্যার কথা শুনতে চান। নিজের জীবনে বাবা-মায়ের অনুপস্থিতি তাকে বুঝিয়েছে, শৈশবের সাধারণ মুহূর্তগুলোও কতটা মূল্যবান।

তবে শাহরুখ খানের গল্পকে কেবল হারানোর বেদনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার জীবনের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো অভিনয়ের সঙ্গে সম্পর্ক। অভিনয় তার কাছে শুধু পেশা হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছিল নিজেকে প্রকাশ করার, অনুভূতিকে মুক্তি দেয়ার এক আশ্রয়। বাস্তব জীবনের যন্ত্রণা থেকে সাময়িকভাবে দূরে গিয়ে অন্য কোনো মানুষের চরিত্রে প্রবেশ করার সুযোগ তাকে দিয়েছিল মঞ্চ ও পর্দা। কখনো প্রেমিক, কখনো বিপ্লবী, কখনো সাধারণ মানুষ— প্রতিটি চরিত্রে যেন নিজের অনুভূতির ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

এখানে শাহরুখের আরেকটি বৈপরীত্য সামনে আসে। পর্দায় যাকে দেখা যায় অনর্গল কথা বলতে, হাসতে, রসিকতা করতে, বাস্তব জীবনে সেই মানুষটিই নিজেকে অনেকটা নির্জনপ্রিয় বলে বর্ণনা করেছেন। 'দ্য উইক'-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত স্বভাব সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি অনেকটা অন্তর্মুখী, একা থাকতে পছন্দ করেন।

শাহরুখ খান একইসঙ্গে অনেকগুলো পরিচয় বহন করেন। তিনি সেই প্রেমিক, যার হাত প্রসারিত করার দৃশ্যে অসংখ্য মানুষ ভালোবাসার ভাষা খুঁজে পেয়েছে। তিনি সেই অভিনেতা, যিনি অন্যের জীবনে প্রবেশ করে নিজের অনুভূতিকে প্রকাশের পথ খুঁজেছেন। তিনি সেই সন্তান, যিনি আজও বাবা-মায়ের স্মৃতিতে ফিরে যান। তিনি সেই বাবা, যিনি নিজের সন্তানদের জীবনে অনুপস্থিতির শূন্যতা তৈরি হতে দিতে চান না। তিনি সেই স্বামী, যিনি পর্দায় বারবার অন্য কারো প্রেমে বিলীন হয়েও দিনশেষে ঘরেই ফিরে এসেছেন। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি কোটি মানুষের ভালোবাসায় ঘেরা থেকেও কখনো নিঃসঙ্গ বোধ করার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।

তার জীবনের এই বৈপরীত্যকে বিষণ্নতার রোমান্টিক গল্পে পরিণত করার প্রয়োজন নেই। মানুষের জীবন সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার সরল সমীকরণে চলে না। খ্যাতি সব ক্ষত সারিয়ে দেয় না, ভালোবাসা সব শূন্যতা পূরণ করতে পারে না, আর সাফল্য মানেই যে প্রতিটি মুহূর্তে সুখী থাকা-তেমনও নয়। শাহরুখ খানের গল্পের সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই, তিনি যে মিথ হয়ে উঠেছেন, তার আড়ালে একজন অসম্পূর্ণ, স্মৃতিকাতর, অনুভূতিপ্রবণ মানুষের অস্তিত্বও রয়ে গেছে।

পৃথিবী তাকে চেনে বলিউডের বাদশাহ হিসেবে। কিন্তু সেই মুকুটের আড়ালে থাকা মানুষটিরও কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি আছে, কিছু অপূরণীয় অভাব আছে, কিছু নীরব মুহূর্ত আছে— যেখানে কোনো ক্যামেরা পৌঁছায় না, কোনো করতালি শোনা যায় না। হয়তো সেই মুহূর্তগুলোতেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠেন শাহরুখ খান— সুপারস্টার হিসেবে নয়, কেবল একজন মানুষ হিসেবে।