ভারতের জনপ্রিয় টেলিভিশন গেম শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র সেট। আসন্ন সিনেমা ‘যাব তাক হ্যাঁয় জান’-এর প্রচারণায় এসেছেন শাহরুখ খান ও ক্যাটরিনা কাইফ। যশ চোপড়ার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতার প্রশ্নের উত্তরে সঞ্চালক অমিতাভ বচ্চনকে শাহরুখ বললেন, ‘আমি তাকে বলতাম দিওয়ার, ত্রিশূলের মতো একটা সিনেমা বানান। আমাকে সেখানে কাস্ট করুন। তিনি আমাকে বলতেন, আপাতত রোমান্টিক সিনেমাই করো তুমি।’
শাহরুখ হয়তো মজা করেই কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি অ্যাকশন সিনেমার প্রতি নিজের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু শাহরুখ খানের উত্থান অ্যাকশন দিয়ে হয়নি, তথাকথিত সুদর্শন না হয়েও তিনি রোমান্টিক বয় হয়ে উঠেছিলেন। অনেকেই বলেন তারা শাহরুখের কাছ থেকে রোমান্স শিখেছেন। আসলে রোমান্টিকের পাশাপাশি নব্বই ও দুই হাজার সালের প্রথম দশকের সিনেমাগুলো বিশ্লেষণ করে বলা যায় শাহরুখ ছিলেন ‘বলিউডের প্রথম সফট বয়’।
সত্তর ও আশির দশকের বলিউড। সিনেমার প্রধান বিষয় ছিল বিদ্রোহ, বিরোধ ও অ্যাকশন। নায়করা ছিল ‘শক্তিশালী পুরুষ’। দেখতে শক্তিশালী না হলেও তাদের স্ক্রিনে পৌরুষ প্রদর্শন করতে দেখা যেত। অমিতাভ বচ্চন হয়ে উঠেছিলেন অ্যাংরি ইয়াং ম্যান। বিনোদ খান্নার কিছু সিনেমাও সে ধারার। শশী কাপুর ন্যায়ের পরাকাষ্ঠা দেখাতেন। এ নায়করা ছিলেন ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার একটা মডেল। দক্ষিণে রজনীকান্ত অতিমানবীয় অ্যাকশন স্টার। মারামারি, ক্রোধ, পোশাক, সিগারেট ধরানোর স্টাইল সবকিছু মিলিয়ে তারা যেন পুরুষ হওয়ার একটা মডেল তৈরি করেছিলেন।

শাহরুখ খান এসে নায়ককে একেবারে অন্যভাবে হাজির করলেন। তার চরিত্রগুলো অনেক সময়ই শক্তিশালী, কিন্তু সে শক্তির প্রদর্শন নেই। তারা প্রেমে পড়ে। কাঁদে। ভয় পায়। অপেক্ষা করে। প্রত্যাখ্যাত হলে ভেঙে পড়ে। (‘কাভি হা কাভি না’ মনে পড়ে?) নারীর সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়। প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়। প্রেম পাওয়ার জন্য তারা সবসময় জোর করে না; বরং অনেক সময় অপেক্ষা করে, বোঝানোর চেষ্টা করে।
দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গের রাজ তেমনই এক চরিত্র। সে কখনই টক্সিক পুরুষ নয়। ইউরোপে সিমরানের সঙ্গে থাকাকালীন সে তার সঙ্গে মজা করে, দুষ্টুমি করে, প্রেমে পড়ে; কিন্তু তাকে অসম্মান করে না। তার প্রেমে একটা খুনসুটি আছে, কিন্তু অধিকারবোধ নেই। সে সিমরানকে নিজের সম্পত্তি মনে করে না। তাই সে সিমরানের বাবার কাছে ‘পছন্দনীয় পাত্র’ হয়ে উঠতে চায়। শেষ অবদি বেধম মার খেতেও তার আপত্তি নেই।
পরদেশে শাহরুখ খান আরো একবার সে রকম চরিত্র নিয়ে এলেন। অর্জুন গঙ্গার প্রেমে পড়ে। কিন্তু গঙ্গার প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশের পথটা দখলদারির নয়। বন্ধুত্ব, দায়িত্ব ও ভালোবাসার মধ্যে সে নিজের অবস্থান খুঁজে নেয়। মোহাব্বতের রাজ মালহোত্রাকে ‘ন্যাকা’ মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে রাজ ফিরে আসে মেঘার জন্য। মেঘা তার বাবাকে ভালোবাসত বলে রাজ তাকে প্রত্যাখ্যান করা নারায়ণ শঙ্করকে ভালোবাসা দিয়ে জয় করতে চেয়েছে। রাজের ভালোবাসা তাই জয় করার চেয়ে অপেক্ষা করার গল্প।
শাহরুখের এ পুরুষ চরিত্রগুলোকে আরো ভালোভাবে বুঝতে হলে কাভি হা কাভি নার সুনীলকে মনে করা যায়। সুনীল নায়কোচিত অর্থে আদর্শ পুরুষ নয়। বরং দুর্বলতাগুলোই তাকে মানুষ করে তোলে। সে প্রেমে জিততে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের পরাজয় মেনে নেয়ার ক্ষমতাও তার আছে। নব্বইয়ের দশকের বলিউডে এমন নায়ক খুব পরিচিত ছিল না।
যশ চোপড়ার ‘ডর’-এর শাহরুখ ভীতিকর। কিন্তু ‘বীর-জারা’য় শাহরুখের সফটনেস আরো গভীর হয়। বীর প্রতাপ সিংয়ের পৌরুষ কম ছিল না। কিন্তু সে বেছে নেয় প্রেমিকার সম্মান। জারাকে ভালোবাসে বলেই তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য জোর করে না। বরং তার জন্য নিজের জীবন, নিজের যৌবন পর্যন্ত বিসর্জন দেয়। কারাগারে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়।
একই ঘটনা ঘটে ‘যাব তাক হ্যাঁয় জান’-এ। যশ চোপড়ার রোমান্স, নায়কের প্রেম অন্য মাত্রার। তিনিই ‘সিলসিলা’, ‘কাভি কাভি’র মতো সিনেমার নির্মাতা। ‘সিলসিলা’র অমিতকে তার লয়্যালটির জন্য প্রশ্ন করা যায়, কিন্তু সমর আনন্দকে যায় না। আকিরার প্রতি তার প্রেম হয়তো তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সে অপেক্ষা করে ছিল মীরার জন্যই।
‘ইয়েস বস’-এর রাহুল শক্তি প্রদর্শন করেনি। ‘কাল হো না হো’র আমান তো ভালোবাসাকে নিয়ে গেল অন্য মাত্রায়। ‘রব নে বানা দি জোড়ি’কে অনেকেই ভুল বোঝে। কিন্তু সুরিন্দর সাহনি সফট পুরুষের একটা চমৎকার উদাহরণ। সে প্রতিনিয়িত তার স্ত্রীকে জয় করার চেষ্টা করে যায়।
আর সবচেয়ে আলাদা হয়তো রিজওয়ান খান। অ্যাসপারগার সিনড্রোমে আক্রান্ত রিজওয়ান পুরো আমেরিকা চষে বেড়ায় একা—মন্দিরার জন্য। তার হাতে বন্দুক নেই। সে মারামারি করতে পারে না। তার শরীরী শক্তি কোনো অর্থেই অ্যাকশন হিরোর মতো নয়। কিন্তু ভালোবাসার জায়গায় তার দৃঢ়তা অসাধারণ। সে নিজের সীমাবদ্ধতা জেনেও ভালোবাসার মানুষের কাছে পৌঁছতে হাজার মাইল হাঁটে।
একই রকম কথা খাটে মোহন ভার্গব (স্বদেশ), কবির খানের ক্ষেত্রেও। সিনেমাগুলোয় তিনি পুরুষত্বের আরেকটি সংজ্ঞা তৈরি করেন। তিনি খেলোয়াড়দের ওপর কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেন না; বরং তাদের নিজেদের শক্তি খুঁজে নিতে সাহায্য করেন। এ দুই চরিত্রও দেখিয়ে দেয় শাহরুখের ‘সফট’ পুরুষ মানেই দুর্বল পুরুষ নয়।










