যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্টন স্কুলের অধ্যাপক শিরি মেলুমাড সম্প্রতি ২৫০ জনের ওপর একটি ছোট পরীক্ষা চালান। একজন বন্ধুকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরামর্শ লিখে দেয়া ছিল অংশগ্রহণকারীদের কাজ। পরীক্ষায় দেখা গেছে, লিখতে গিয়ে কেউ তথ্য খুঁজেছেন প্রচলিত গুগল সার্চে, আবার কেউ গিয়েছেন গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) তৈরি স্বয়ংক্রিয় সারসংক্ষেপের ওপর।

অধ্যাপক শিরি মেলুমাড জানান, গুগলের এআইয়ের তৈরি সারসংক্ষেপের ওপর নির্ভর করা ব্যক্তিরা খুব সাধারণ বা সবাই জানে এমন ধরনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শে আলাদা কোনো চিন্তা বা গভীরতা ছিল না, যেমন ‘পুষ্টিকর খাবার খান’, ‘পর্যাপ্ত পানি পান করুন’, ‘ভালো করে ঘুমান’। অন্যদিকে যারা প্রচলিত গুগল সার্চে তথ্য খুঁজেছেন, তারা তুলনামূলকভাবে গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন শারীরিক, মানসিক ও আবেগগত সুস্থতার নানা দিকের ওপর গুরুত্ব দেন তারা।

প্রযুক্তিসংশ্লিষ্টদের দাবি, চ্যাটবট ও এআই সার্চ টুল মানুষের শেখা ও কাজের দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ফলে ভবিষ্যতে যারা এসব ব্যবহার করবে না, তারা পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু অধ্যাপক মেলুমাডের গবেষণাসহ এ-সংক্রান্ত অন্যান্য পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রবন্ধ লেখা বা গবেষণার মতো কাজে এআই টুলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

অধ্যাপক মেলুমাড বর্তমানের এআই যুগকে ‘ব্রেন রট’ শব্দটি দিয়ে ব্যখ্যা করেছেন। এর অর্থ ইন্টারনেটের নিম্নমানের কনটেন্টে অতিরিক্ত ডুবে থাকার ফলে চিন্তাশক্তি ‘ভোঁতা’ হয়ে যাওয়া। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস ২০২৪ সালে ব্রেন রটকে বর্ষসেরা শব্দ হিসেবে ঘোষণা করে। তখন এর সংজ্ঞায় বলা হয়, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ছোট ভিডিও মানুষকে এমনভাবে আসক্ত করেছে, যেন তাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে।

প্রযুক্তি মানুষের জ্ঞান ও চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করছে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। উদাহরণস্বরূপ, দার্শনিক সক্রেটিসও লিখিত ভাষার উদ্ভাবন নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। কারণ তার মতে, মানুষ সবকিছু লিখে রাখলে তাদের মস্তিষ্কের তথ্য মনে রাখার প্রয়োজন কমে যাবে। ফলে মানুষ তাদের স্মৃতিশক্তি পুরোপুরি ব্যবহার করবে না এবং ধীরে ধীরে তা দুর্বল হয়ে পড়বে। এআইয়ের তৈরি ওয়েব সারসংক্ষেপ আসার আগেও ২০০৮ সালে দি আটলান্টিক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল। যেখানে প্রশ্ন করা হয়, ‘গুগল কি আমাদের মূর্খ বানিয়ে তুলছে?’ পরে অবশ্য দেখা গেছে, এ ধরনের উদ্বেগগুলো অতিরঞ্জিত ছিল।

কিন্তু এআই নিয়ে বিশ্লেষকদের বড় উদ্বেগ হলো প্রযুক্তিটি শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর প্রভাব যোগ করলে পরিস্থিতি আরো গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে চলতি বছর প্রকাশিত এক খ্যাতনামা গবেষণায় দেখা হয়েছে, কীভাবে ওপেনএইয়ের চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল মানুষের লেখার ধরনে প্রভাব ফেলে। গবেষণায় ৫৪ জন কলেজ ছাত্রছাত্রী অংশ নিয়েছিলেন। নমুনার আকার ছোট হলেও এর ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—‘এআই মানুষের শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে কিনা।’

গবেষণার তথ্য সংগ্রহের সময় ছাত্র ছাত্রীদের মাথায় একটি সেন্সর লাগানো হয়েছিল। প্রযুক্তিটি তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করত। এ সময় চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ সবচেয়ে কম দেখা গেছে। কারণ তারা লেখার কাজ এআই চ্যাটবটের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।

তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি সামনে আসে ছাত্রছাত্রীদের লেখার কাজ শেষ হলে। প্রবন্ধ শেষ করার ১ মিনিট পর তাদের নিজের লেখার কোনো অংশ উদ্ধৃত করতে বলা হয়। চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের বড় অংশ প্রায় ৮৩ শতাংশ একটি বাক্যও মনে করতে পারেনি। —নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে