কম খরচে পণ্য উৎপাদনে চীন ছিল সব উন্নত দেশ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পছন্দের জায়গা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কারণে চীনে প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের অন্য অনেক দেশও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত দুটি ধাতু গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়াম রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় চীন। এর মাধ্যমে দুটি দেশের মধ্যে প্রযুক্তি খাত নিয়ে চলমান দ্বৈরথ নিয়ে নতুন সংশয় তৈরি হয়েছে।

গিজচায়নায় প্রকাশিত খবরের তথ্যানুযায়ী, এক বিবৃতিতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, যেসব কোম্পানি ৩৮ ধরনের কাঁচামাল রফতানি করে থাকে তাদের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) চিপ ও টেলিকম খাতকে লক্ষ্য করেই এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তের প্রতি চীনের পাটকেল। এটি যে প্রথম নিষেধাজ্ঞা তা নয়। তবে বর্তমানে এ দুটি দেশের মধ্যে প্রযুক্তি খাত নিয়ে যে যুদ্ধ চলছে তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ১ আগস্ট থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।

নেদারল্যান্ডস সরকার সম্প্রতি চীনের কোম্পানির কাছে পণ্য রফতানিতে এএসএমএলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পরই চীন ধাতু রফতানি বন্ধের এ সিদ্ধান্ত নেয়। এএসএমএলই বিশ্বের একমাত্র উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লিথোগ্রাফি মেশিন তৈরি করে থাকে। চিপ উৎপাদন খাতে এ মেশিন বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। চীনের কাছে এ মেশিন বিক্রি বন্ধ করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে মার্কিন চাপের মুখে ছিল ডাচ সরকার। 

কিছু বিশ্লেষকের মতে এ পদক্ষেপ প্রযুক্তি খাতে চলমান যুদ্ধে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে উৎপাদনকাজে যেসব বিশেষ ধাতু ব্যবহার করা হয় সেগুলোর অধিকাংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে বেশকিছু ধাতু চিপ উৎপাদন, টেলিক পণ্য সরবরাহ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যবহার হয়। সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে গ্যালিয়াম ব্যবহার করা হয়।

চীনের রফতানি নিষেধাজ্ঞা প্রযুক্তি খাতের দ্বৈরথে নতুন মোড় নিয়ে আসতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জরিপ অনুযায়ী, চীন ৯৪ শতাংশ গ্যালিয়াম ও ৮৩ শতাংশ জার্মেনিয়াম সরবরাহের সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে দেশটি ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের গ্যালিয়াম আমদানি করেছে।

একাধিক বিশ্লেষকের মতে, চীনের এ নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে পশ্চিমের জন্য তেমন ক্ষতিকর হবে না। চীন সরকারও জানে এসব উপাদান বিশ্বের অনেক দেশেই পাওয়া যাবে। তবে পশ্চিমের সেমিকন্ডাক্টর খাতের অগ্রগতি কমানোই ছিল প্রধান লক্ষ্য। কেননা বিকল্প সরবরাহ মাধ্যম খুঁজে পেতেও বেশ সময় লাগবে।

বিকল্প মাধ্যম থেকে গুরুত্বপূর্ণ এসব ধাতুর সরবরাহ নিশ্চিত করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে চীন নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। শিগগিরই দেশটি টিএসএমসি ও স্যামসাংয়ের মতো উৎপাদনকারী কোম্পানির সমতুল্য হতে চায়। এ দুই প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে উন্নতমানের চিপ উৎপাদনে সক্ষম।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমের দেশগুলো কম সময়ের মধ্যে এসব ধাতুর উৎপাদন শুরু করলেও চীনের নিষেধাজ্ঞার কারণে তা দামের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। চলমান এ যুদ্ধ কবে নাগাদ শেষ হবে সে বিষয়ে সন্দিহান বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টরা। তবে এ সমস্যা চলমান থাকলে সরবরাহ সংকট আরো তীব্র হবে এবং পণ্যের দাম আরো নাগালের বাইরে চলে যাবে।