বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অপরিহার্য সঙ্গী। তবে এখন আধুনিক ডিভাইসগুলোয় নকশা ও কার্যক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও মেরামতযোগ্যতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। অনেকেই নতুন ফোন কেনার পরিবর্তে পুরনো ফোনটিকে মেরামত করতে চান। এতে খরচও কম হয় এবং পরিবেশের ওপর চাপও হ্রাস পায়। কিন্তু বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মেরামতযোগ্যতা বা রিপেয়ারেবিলিটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম স্মার্টফোন নির্মাতা স্যামসাং এমনসব নকশা ব্যবহার করে, যেগুলো ফোন মেরামতকে কঠিন করে তোলে।
প্রায়ই এ নিয়ে অ্যাপলের বেশি সমালোচনা করা হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে অ্যাপলের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী স্যামসাংও একইভাবে ভোক্তাদের জন্য বাধা তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, স্যামসাংয়ের স্মার্টফোনগুলো বাজারের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ডিভাইসগুলোর একটি, যেগুলো মেরামত করতে গিয়ে ভীষণ ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।
» ‘গ্লাস স্যান্ডউইচ’ নকশাই বড় বাধা
স্যামসাংয়ের প্রিমিয়াম গ্যালাক্সি সিরিজ থেকে শুরু করে বাজেট ফোন পর্যন্ত প্রায় সব মডেলের গঠন একরকম। ফোনের ভেতরের অংশ একটি সেন্ট্রাল ফ্রেমে থাকে। সামনে থাকে স্ক্রিন এবং পেছনে থাকে গ্লাস বা প্লাস্টিক প্যানেল। দুটোই শক্ত আঠা দিয়ে আটকানো। এতে ফোন দেখতে আকর্ষণীয় হয় এবং পানি ও ধুলাবালি প্রতিরোধ ক্ষমতাও বজায় থাকে। তবে এ কারণে ব্যাটারি বা ডিসপ্লে পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এক দশক আগে পর্যন্ত, যেমন গ্যালাক্সি এস৫ মডেলে ব্যাটারি সহজেই খুলে ফেলা যেত। কিন্তু এস৬ থেকে শুরু হয় ইউনিবডি নকশা, যেখানে ব্যাটারিতে পৌঁছতে হলে গরম করে আঠা আলগা করতে হয়। এতে ফোন ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
» বাঁকানো স্ক্রিন ও খরচের ঝামেলা
স্যামসাংয়ের ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোয় বহু বছর ধরে বাঁকানো বা কার্ভড ডিসপ্লে দেয়া হচ্ছিল। দেখতে আকর্ষণীয় হলেও এগুলো পরিবর্তন করা ভীষণ কঠিন ছিল। সম্প্রতি কোম্পানি আবার সমতল ডিসপ্লেতে ফিরেছে, যা কিছুটা সুবিধা এনেছে। তবু খরচের সমস্যা থেকে গেছে।
২০২৪ সালে জনপ্রিয় রিপেয়ার প্লাটফর্ম আইফিক্সইট স্যামসাংয়ের সঙ্গে তাদের দুই বছরের অংশীদারত্ব বন্ধ করে দেয়। তাদের অভিযোগ, স্যামসাংয়ের অফিশিয়াল যন্ত্রাংশের দাম এত বেশি যে অনেক ব্যবহারকারী মেরামতের বদলে নতুন ফোন কিনতে বাধ্য হন।
» নতুন মডেলে সামান্য উন্নতি
সমালোচনার মুখে স্যামসাং কিছু পরিবর্তন এনেছে। গ্যালাক্সি এস২৪ আল্ট্রা মডেলে সমতল স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়েছে, আর এ বছরের গ্যালাক্সি এস২৫ আল্ট্রায় ব্যাটারি খোলার জন্য নতুন ‘পুল-ট্যাব’ যুক্ত করা হয়েছে। এতে ঝুঁকি কমে এসেছে এবং মেরামত কিছুটা সহজ হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো যথেষ্ট নয়। শুধু স্যামসাং নয়, পুরো স্মার্টফোন শিল্পই মেরামতযোগ্যতার সংকটে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যাপল তাদের সিরিয়ালাইজড পার্টস নীতি চালু করেছে, যা প্রায়ই অননুমোদিত মেরামতকে অকার্যকর করে দেয়।
» ভোক্তাদের বিকল্প সীমিত
সহজে মেরামতযোগ্য ফোন চাইলে ভোক্তাদের সামনে খুব কম বিকল্পই রয়েছে। ইউরোপীয় কোম্পানি ফেয়ারফোনের তৈরি ফেয়ারফোন ৬ মডেল মেরামতযোগ্যতার জন্য আদর্শ হলেও এতে মাঝারি মানের প্রসেসর ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে উচ্চ মানের পারফরম্যান্স খোঁজেন যারা, তাদের কাছে এটি কম জনপ্রিয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোন নির্মাতারা যে আঠা, যন্ত্রাংশের খরচ কিংবা নকশা বেছে নেন সবই তাদের সচেতন সিদ্ধান্ত। এতে ফোন অবশ্যই আড়ম্বরপূর্ণ ও টেকসই হয়, কিন্তু মেরামতের সুযোগ সীমিত হয়। আর ভোক্তাদের জন্য এর মানে বেশি খরচ ও কম বিকল্প। —স্ল্যাশগিয়ার অবলম্বনে










