চিপ নির্মাণে চীনের প্রচেষ্টা রুখে দিতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব পদক্ষেপ দেশটির অগ্রযাত্রাকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করলেও একেবারে বন্ধ করে দিতে পারেনি। সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে চীন এ খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির (টিএসএমসি) চেয়ে খুব বেশি পিছিয়ে নেই। টোকিওভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা কোম্পানি টেকঅ্যানালাইয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ খাতে টিএসএমসির চেয়ে তিন বছর পিছিয়ে চীন। কোম্পানিটির সিইও হিরোহারু শিমিজু সম্প্রতি এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর নিক্কেইএশিয়া।
শিমিজু স্মার্টফোনের চলতি বছরের এপ্রিলের উন্মোচিত স্মার্টফোন পিউরা ৭০ প্রো এবং ২০২১ সালের শীর্ষস্থানীয় একটি ফোনের প্রসেসরের সার্কিট ডায়াগ্রাম বিশ্লেষণ করে এ মন্তব্য করেন। পিউরা ৭০ প্রোর ‘কিরিন ৯০১০’ চিপ ডিজাইন করেছে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হাইসিলিকন। চিপটি ইন্ডাস্ট্রি পর্যায়ে উৎপাদন করেছে আরেক চীনা কোম্পানি সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন (এসএমআইসি)। অন্যদিকে ২০২১ সালের ফোনটির ‘কিরিন ৯০০০’ চিপও ডিজাইন করেছে হাইসিলিকন। এটি ইন্ডাস্ট্রি পর্যায়ে উৎপাদন করেছে টিএসএমসি।
চীনা চিপ প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা রুখে দেয়ার অংশ হিসেবে এসএমআইসির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কোম্পানিটি ৭ ন্যানোমিটার আকারের চিপ উৎপাদন করতে সক্ষম। অন্যদিকে টিএসএমসি ২০২১ সালে হুয়াওয়েকে ৫ ন্যানোমিটারের প্রসেসর সরবরাহ করেছিল।
সাধারণত ন্যানোমিটার যত কম হবে, চিপের পারফরম্যান্স তত বেশি হয়। চিপের আকারও সে হিসেবে কমে আসে। ইন্ডাস্ট্রি পর্যায়ে উৎপাদিত এসএমআইসির ৭ ন্যানোমিটারের চিপের আকার ১১৮ দশমিক ৪ বর্গমিলিমিটার, যেখানে টিএসএমসির ৫ ন্যানোমিটার চিপের আকার ১০৭ দশমিক ৮ বর্গমিলিমিটার। দুটি চিপের আকার ও পারফরম্যান্স প্রায় সমান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পারফরম্যান্স বিবেচনায় এসএমআইসির সক্ষমতা বাড়লেও এখনো তা টিএসএমসির তুলনায় তিন বছর পিছিয়ে। হাইসিলিকনের ডিজাইন করা চিপগুলোর আকার কিছুটা প্রশস্ত। তা সত্ত্বেও টিএসএমসির ৫ ন্যানোমিটারের চিপের সমান পারফরম্যান্স দিচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে ডিজাইনে তাদের সক্ষমতা বেড়েছে।
হুয়াওয়ের পিউরা ৭০ প্রো মোট ৩৭টি সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে সজ্জিত। এগুলো স্মার্টফোনটির মেমরি, সেন্সর, ক্যামেরা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ডিসপ্লের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে ১৪টি সেমিকন্ডাক্টর হাইসিলিকন তৈরি করেছে। এছাড়া ১৮টি চিপ অন্যান্য চীনা কোম্পানি এবং পাঁচটি বিদেশী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। ডিআরএএম ডিজাইন করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্স। অন্যদিকে মোশন সেন্সর তৈরি করেছে জার্মান কোম্পানি বোশ। ফোনের ৮৬ শতাংশ চিপ চীনেই তৈরি।
শিমিজু বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশনের জন্য ব্যবহার হয়, এমন অত্যাধুনিক সার্ভার চিপ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। তবে স্মার্টফোন বা অন্যান্য ডিভাইসের চিপ সামরিক হুমকি তৈরি করে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এ ধরনের চিপ তৈরির অনুমতি দেবে।’
শিল্পগোষ্ঠী এসইএমআইর তথ্যমতে, চীন ২০২৩ সালে বৈশ্বিক চিপ তৈরির মোট যন্ত্রপাতির ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ ক্রয় করেছে, যা দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মোট ক্রয়ের প্রায় দ্বিগুণ। দেশটি রফতানি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না, এমন যন্ত্রপাতি কেনার দিকে মনোনিবেশ করেছে এবং এর মাধ্যমে নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে।
এ প্রেক্ষাপটে এসএমআইসির ৭ ন্যানোমিটারের চিপ পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে টিএসএমসির ৫ ন্যানোমিটারের চিপের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এটি আগামী দিনে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। টিএসএমসিও প্রযুক্তিগতভাবে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে এগিয়ে থাকতে আরো বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। কারণ চিপের আকার আরো ছোট করা ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে।
শিমিজু বলেন, ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এখন পর্যন্ত চীনের অগ্রযাত্রাকে সামান্য বাধাগ্রস্ত করেছে। তবে প্রকারান্তরে এটি চীনের অভ্যন্তরে চিপ উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করছে।’










