কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জন্য সে সুযোগ নেই। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর ৪টায় কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বকাপ অভিষেক হতে যাচ্ছে মরক্কোর বিপক্ষে, যারা চার বছর আগে বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ম্যাচটি কেবল দুই দলের শক্তির লড়াই নয়, বরং ব্রাজিলের ফুটবল পরিচয়েরও এক নতুন পরীক্ষার মঞ্চ।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল মানেই সমর্থকদের চোখে ভাসে সাম্বার চিরচেনা ছন্দ, যেখানে জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ‘জোগা বোনিতো’র রোমান্টিসিজম। কিন্তু ইতালিয়ান মায়েস্ত্রো আনচেলত্তির ফুটবলীয় ব্যাকরণটা কিছুটা ভিন্ন। ‘ডন কার্লো’ বিরক্তিকর ফুটবল খেলান না বটে, তবে লাতিন আবেগের চেয়ে তিনি ঢের বাস্তববাদী। তার কাছে মাঠের সৌন্দর্যের চেয়েও চূড়ান্ত ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দলের স্টারডম সামলাতে সিদ্ধহস্ত হলেও তার রণকৌশল কখনো একক তারকার ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে না। বরং নিরেট ছক আর দলগত শৃঙ্খলাই মূল অস্ত্র।

ঠিক এ জায়গাতেই জমে উঠেছে ব্রাজিল বনাম মরক্কো ম্যাচের সমীকরণ। একদিকে সাম্বার ঐতিহ্য আর আনচেলত্তির এ হিসাবি ছকের যুগলবন্দি, অন্যদিকে আটলাস পর্বতের অদম্য সিংহ মরক্কো; যারা গত বিশ্বকাপে স্পেন ও পর্তুগালের মতো পরাশক্তিকে মাটিতে নামিয়ে প্রমাণ করেছিল রূপকথা বলে কিছু নেই, সবই নিরেট কৌশল। হেক্সা মিশনে আসা ব্রাজিলের সামনে তাই প্রশ্নবোধক চিহ্ন—আনচেলত্তির প্রাগমেটিক রণকৌশল কি পারবে মরক্কোর দুর্ভেদ্য রক্ষণব্যূহে ফাটল ধরাতে?

কাতার বিশ্বকাপের সেই ‘লাল বিপ্লব’-এর রেশ এখনো মরক্কোর গায়ে মেখে আছে। একের পর এক ইউরোপীয় শক্তিকে বিদায় করে তারা পৌঁছে গিয়েছিল সেমিফাইনালে। অনেকে রূপকথা বললেও ট্যাকটিক্যালি ছিল নিখুঁত শৃঙ্খলা। অন্যদিকে ব্রাজিল যেন কয়েক বছর ধরে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগর পাড়ি দিচ্ছে। তিন বছরে চার কোচের আসা-যাওয়ার ঘূর্ণিপাকে সেলেসাওদের সাম্বার সুর অনেকটাই বেসুরো। এমন এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আনচেলত্তির কাঁধে এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল দলের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের চাপ। ক্লাব ফুটবলে তিনি দিগ্বিজয়ী বীর কিন্তু বিশ্বকাপ তো আরো নির্মম। এখানে ঘড়ির কাঁটা বড্ড নিষ্ঠুর, ভুলের সুযোগ একেবারেই নেই, বিপরীতে প্রত্যাশা হিমালয়সম।

পাহাড়সম সেই প্রত্যাশার চাপ সামলে ফুটবলের এ মহাদ্বৈরথে নামার আগেই আনচেলত্তির কপালে সবচেয়ে বড় চিন্তার ভাঁজ হয়ে দাঁড়িয়েছে নেইমার জুনিয়রের অনুপস্থিতি। তার শূন্যতা আনচেলত্তির চিরায়ত ৪-২-৩-১ ফরমেশনের ছককে বাধ্য করতে পারে নতুন করে সাজাতে। এখন আর মাঝখান দিয়ে আক্রমণের সেই জাদুকরী সুতোর বুনন থাকছে না, বরং ব্রাজিলকে নির্ভর করতে হচ্ছে মাঠের দুই প্রান্তের গতির ঝড়ের ওপর, যাকে ট্যাকটিক্যাল ভাষায় বলা হয় উইং-প্লে। স্ট্রাইকার হিসেবে এ ম্যাচে মূল একাদশে জায়গা পেতে যাওয়া ইগর থিয়াগো মূলত একজন প্রথাগত নাম্বার নাইন। কিন্তু গোলের সুযোগ তৈরি করার দায়িত্বটি নিশ্চিতভাবেই বর্তাবে দুই উইঙ্গার ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনহার পায়ে-মাথায়। লুকাস পাকেতাকে এখন থিয়াগোর পেছনে থেকে হাফ স্পেসগুলোতে সংযোগকারী হিসেবে কাজ করতে হবে।

ব্রাজিলের মাঝমাঠের গল্পটা অবশ্য ভিন্ন। কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারায়েসের ডাবল-পিভট যেন নিপুণ যন্ত্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গিয়ার। কাসেমিরো এখানে অতন্দ্র প্রহরীর মতো নিচে অবস্থান করে প্রতিপক্ষের প্রতি-আক্রমণগুলোকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করবেন। আর এ সুযোগে গিমারায়েস বল পায়ে স্বাধীনভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চিরে ফেলার রসদ জোগাবেন।

কিন্তু আক্রমণের এ রূপকথার উল্টো পিঠে ব্রাজিলের রক্ষণে লুকিয়ে আছে এক বড় শঙ্কা। এডের মিলিতাও এবং ওয়েসলির অপ্রত্যাশিত ইনজুরি আনচেলত্তির জন্য এক বড় ধরনের দুঃস্বপ্ন হয়ে এসেছে। মার্কিনিওস এবং গ্যাব্রিয়েল ম্যাগালহায়েসের বিশ্বস্ত সেন্ট্রাল ডিফেন্স জুটির ওপর তাই এখন পাহাড়সম চাপ। রাইট-ব্যাকে দানিলোকে হয়তো তার স্বভাবজাত ওভারল্যাপ করে আক্রমণের চেয়ে নিজের ঘর সামলানোর দিকেই বেশি মনোযোগী হতে হবে। কারণ একটুখানি জায়গা পেলেই মরক্কোর ক্ষিপ্র গতির উইঙ্গাররা সেই সুযোগে আঘাত হানতে ভুলবে না। এ রক্ষণাত্মক দুর্বলতা ঢেকে রাখাই হবে আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় ট্যাকটিক্যাল পরীক্ষা।

মরক্কোও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালের অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের পর দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুইয়ের বিদায়ে দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন যুবদলের কারিগর মোহাম্মদ ওউয়াহবি। সম্ভবত তার কৌশলগত ছকটি আবর্তিত হবে দুর্ভেদ্য লো-ব্লক ডিফেন্স আর বিষাক্ত কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর ভিত্তি করে। তবে মরক্কোর এ জমাট রক্ষণদুর্গেও পড়েছে ইনজুরির থাবা। দলের সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার নায়েফ আগের্ডের ইনজুরি যেন এ দুর্গের সবচেয়ে বড় ফাটল। তার জায়গায় তরুণ ইসা দিওপ এবং শাদি রিয়াদকে এখন ব্রাজিলের আক্রমণভাগের গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে। লেফট ব্যাক নৌসাইর মাজরাউইয়ের কাঁধের চোট আর সেট-পিস স্পেশালিস্ট এজ আবদের ছিটকে যাওয়া মরক্কোর আক্রমণাত্মক বৈচিত্র্যকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। তবুও দলীয় শৃঙ্খলা, নিখুঁত প্রেসিং আর একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করার অদম্য মানসিকতাই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় লড়াইয়ের গতিপথ মূলত নির্ধারিত হবে কয়েকটি ব্যক্তিগত দ্বৈরথের কাব্যিক ছন্দেও। সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো লড়াইটি হবে মাঠের বাঁ প্রান্তে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মুখোমুখি হবেন মরক্কোর আক্রমণাত্মক রাইট-ব্যাক আশরাফ হাকিমি। হাকিমি স্বভাবজাতভাবেই আক্রমণে উঠতে ভালোবাসেন, কিন্তু এ ম্যাচে তিনি যদি নিজের ঘর অরক্ষিত রেখে বেশি সামনে এগিয়ে যান, তবে ভিনিসিয়ুস সে ফাঁকা জায়গায় এক প্রলয়ংকরী ঝড় তুলতে পারেন। অন্যদিকে ব্রুনো গিমারায়েস যখন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করবেন, তখন তাকে রুখে দেয়ার কঠিন দায়িত্ব নিতে হবে মরক্কোর তরুণ তুর্কি আইয়ুব বুয়াদি ও নাবিল এল আয়নাউইকে। মরক্কোর আক্রমণের প্রধান রূপকার ব্রাহিম দিয়াজ মাঠের ডান প্রান্ত থেকে বারবার ভেতরে ঢুকে এসে ব্রাজিলের দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার মার্কিনিওস ও গ্যাব্রিয়েলকে তাদের জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়ার এক ধূর্ত কৌশল অবলম্বন করবেন। এ ছোট ছোট ব্যক্তিগত লড়াইগুলোই শেষ পর্যন্ত গড়ে দেবে বড় কোনো ব্যবধান।

এ দুই দলের লড়াইয়ের স্মৃতি খুব একটা দীর্ঘ নয়। বিশ্বমঞ্চে তাদের একমাত্র সাক্ষাতের গল্পটি সেই ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের, যখন রোনালদো-রিভালদোদের ব্রাজিল ৩-০ গোলের দাপুটে জয় তুলে নিয়েছিল। কিন্তু দুই যুগ পেরিয়ে বর্তমান মরক্কো আর অতীতের মরক্কোর মধ্যে এখন আকাশ-পাতাল তফাৎ। বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান হয়তো ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলে, কিন্তু ২০২৩ সালে এক প্রীতি ম্যাচে এই ব্রাজিলকেই ২-১ গোলে হারানোর টাটকা স্মৃতি রয়েছে আটলাস সিংহদের। সাম্প্রতিক সময়ে পরাশক্তিগুলোকে মাটিতে নামিয়ে আনার যে অবিশ্বাস্য রণনৈপুণ্য মরক্কো দেখিয়েছে, তাতে অতীতের কোনো পরিসংখ্যান দিয়েই এ মহাদ্বৈরথের ভাগ্য আগে থেকে লিখে রাখা সম্ভব নয়।

ম্যাচের সম্ভাব্য চিত্রনাট্যে দুই দলই তাদের সেরা যোদ্ধাদের নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রাজিলের গোলবার পাহারায় থাকবেন চীনের প্রাচীরের মতো বিশ্বস্ত আলিসন বেকার। রক্ষণের চার সেনানী হিসেবে লেফট ব্যাকে ডগলাস, সেন্টারে মার্কিনিওস ও গ্যাব্রিয়েল এবং রাইট ব্যাকে দানিলোর সামনে মাঝমাঠের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেবেন কাসেমিরো ও গিমারায়েস। আর আক্রমণের অগ্রভাগে ভিনিসিয়ুস, রাফিনহা ও পাকেতার তৈরি করা সুযোগগুলোকে গোলে পরিণত করার অপেক্ষায় থাকবেন ইগর থিয়াগো।

অন্যদিকে মরক্কোর গোলপোস্টে ইয়াসিন বোনো থাকবেন এক অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায়। তার সামনে রক্ষণের ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন মাজরাউই, দিওপ, রিয়াদ ও হাকিমি। মাঝমাঠে আয়নাউই ও বুয়াদির সামনে থেকে দলের আক্রমণের সুর বেঁধে দেবেন এল খান্নৌস, ওউনাহি এবং দিয়াজ। আর ব্রাজিলের রক্ষণকে বিভ্রান্ত করার মূল দায়িত্বে থাকবেন সেন্ট্রাল ফরওয়ার্ড ইলিয়াস সাইবারি।

খেলোয়াড়দের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি পাস আর ট্যাকলের ওপর নির্ভর করছে ম্যাচের ভাগ্য। এ ম্যাচ কেবল তিন পয়েন্টের লড়াই নয়; এটি আনচেলত্তির ব্রাজিল কতটা প্রস্তুত এবং মরক্কোর রূপকথা এখনো কতটা জীবন্ত—তারও প্রথম পরীক্ষা।