দৃঢ়তা ও কোমলতার মিশেলে তিনি গড়ে তুলেছেন ভিন্নধর্মী নায়কচরিত্র। তার অভিনয় শুধু লড়াই নয়, আবেগেরও গভীর প্রকাশ।

অ্যাকশন নায়ক বলতে সাধারণত বোঝানো হয় দুঃসাহসিক স্টান্ট বা শক্তিশালী শরীর। কেউ নজর কাড়েন দুঃসাহসিক স্টান্টে—যেমন ‘মিশন: ইম্পসিবল’ সিরিজে টম ক্রুজ। আবার কেউ বিখ্যাত হন পেশিবহুল দেহগঠনের জন্য—যেমন আশির দশকের হলিউড তারকা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, সিলভেস্টার স্ট্যালোন ও জ্যাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যাম। কিন্তু এই প্রায় অজেয়, অমর চরিত্রগুলোর বিপরীতে একজন অভিনয়শিল্পী আছেন, যিনি নিজেকে ভীষণ মানবিক হিসেবেই তুলে ধরেছেন—তিনি চৌ ইউন-ফ্যাট। হংকংয়ের প্রভাবশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকশন চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম তারকা।

চৌ ইউন-ফ্যাট অ্যাকশন সিনেমার যে প্রচলিত ধারণা, তা ভেঙেছেন।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন অ্যাকশন নায়কও হতে পারেন সংবেদনশীল।

পরিচালক জন উর সঙ্গে তার কাজ তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ‘আ বেটার টুমরো’, ‘দ্য কিলার’, ‘হার্ডবয়েলড’—এ তিন চলচ্চিত্র তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে।

সম্প্রতি এসব সিনেমা নতুন করে ৪কে সংস্করণে মুক্তি পেয়েছে।

এ চলচ্চিত্রগুলোতে চৌ কখনো গ্যাংস্টার, কখনো পুলিশ, আবার কখনো খুনি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। প্রতিটি চরিত্রেই রয়েছে ভেতরের দ্বন্দ্ব ও মানবিকতা। তিনি একই সঙ্গে দৃঢ় ও ভঙ্গুর। বিশেষ করে ‘দ্য কিলার’ সিনেমাতে তার অভিনয় দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। তার সবচেয়ে প্রভাবশালী চরিত্রগুলোর একটি ‘দ্য কিলার’-এর আহ জং। সিনেমাটিতে তিনি একজন পেশাদার খুনি। গল্পে দুর্ঘটনায় এক গায়িকাকে অন্ধ করে ফেলেন তিনি এবং এরপর অনুতপ্ত হয়ে মুক্তির পথ খোঁজেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে আহত এ চরিত্র চৌ এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা তাকে একাধারে শক্তিশালী ও গভীরভাবে মানবিক করে তোলে। এ চরিত্রের প্রভাব পরবর্তীকালের বহু চলচ্চিত্রে দেখা যায়—বিশেষ করে ঠাণ্ডা মাথার খুনির মানবিক রূপান্তরের গল্পগুলোতে। যেমন ‘জন উইক’। চৌর অভিনয়ের এ মানবিকতা ও শীতল স্টাইল আজও প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

সমালোচকদের মতে, চৌ ইউন-ফ্যাটের আসল শক্তি তার বহুমাত্রিক অভিনয়। তিনি শুধু অ্যাকশন দৃশ্যেই নয়, আবেগ প্রকাশেও সমান দক্ষ।

তার চোখের অভিব্যক্তি চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলে।

চলচ্চিত্র সমালোচক শন গিলম্যানের মতে, জ্যাকি চ্যান বা জেট লি’র মতো চৌ কখনো চমকপ্রদ স্টান্ট দিয়ে দর্শককে বিস্মিত করেননি। বরং তার শক্তি ছিল অভিনয়ের বহুমাত্রিকতায়—তিনি কখনো বার্ট ল্যাঙ্কাস্টারের মতো শারীরিক, কখনো অ্যালাঁ দেলোঁর মতো স্টাইলিশ, কখনো ক্যারি গ্রান্টের মতো পরিশীলিত, আবার কখনো জেরি লুইসের মতো হাস্যরসাত্মক ভূমিকায় অভিনয় করেন। অনেক সময় একই সিনেমাতেই এই সব রূপ একসঙ্গে ফুটে ওঠে।

তার এ অভিনয়ধারা পরবর্তীকালের সিনেমায় প্রভাব ফেলেছে। কিয়ানু রিভিসের ‘জন উইক’ সিরিজেও সেই ছাপ দেখা যায়। ‘হার্ড বয়েলড’ সিনেমাতে তিনি এক আবেগপ্রবণ পুলিশ চরিত্রে অভিনয় করেন।

এখানে তাকে দেখা যায় ভিন্ন এক রূপে। তিনি শুধু লড়াই করেন না, অনুভবও করেন।

বর্তমান সময়ে সুপারহিরো নির্ভর সিনেমার ভিড়ে চৌ ইউন-ফ্যাট এক ব্যতিক্রম। তার চরিত্রগুলো অতিমানব নয়, বরং বাস্তব মানুষের প্রতিচ্ছবি।

তাদের আছে দুর্বলতা, ভালোবাসা ও দ্বন্দ্ব। আজকের প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও ঝলমলে দুনিয়ায় নায়করা প্রায়ই অতিমানব। ডিজিটাল শক্তিতে তারা অজেয় হয়ে ওঠেন।

কিন্তু চৌ ইউন-ফ্যাট ভিন্ন এক পথ দেখান। সিনেমার নায়করাও যে বাস্তব মানুষ। তারা আঘাত পান। তারা কাঁদেন। তারা ভুল করেন। আবার উঠে দাঁড়ান। এ মানবিকতাই চৌ ইউন-ফ্যাট আলাদা করে। তার অভিনয়ে থাকে হৃদয়ের স্পন্দন। দর্শক তার সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পায়। অবিশ্বাস্য অ্যাকশনও তখন বিশ্বাসযোগ্য লাগে। এ কারণেই তিনি শুধু একজন অ্যাকশন তারকা নন। তিনি অ্যাকশন সিনেমায় মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

সূত্র: বিবিসি