এর মধ্যেই ঘরের কোনায় ক্যাসেট প্লেয়ারে কম ভলিউমে বাজছে গান। শুনে মনে হয় ইউটোপীয় কোনো এক জগৎ। তখন মনে হয়নি, এখন প্রায় পরিণত বয়সে এসে মনে হচ্ছে। কেননা গানের কথা ছিল, ‘ছোট্ট একটা ভালোবাসা/ এইতো শুধু চায় গো সবাই/ একটা শুধু ভালোবাসা/ এটাই যেন পায়গো সবাই।’ সেই দিনের আগে ও পরে আশা ভোঁসলের বহু গান শোনা হয়েছে, তাকে আবিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু কানে লেগে থেকেছে এই কয়েকটা লাইন। এর অনেক পরে জেনেছি, রোমান্টিক, মেলানকোলিক, ডিস্কো, জ্যাজ থেকে আধুনিক— সব জনরার গানেই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে।

জনপ্রিয়তা আশা পেয়েছিলেন, কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বহু দিন। প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে বলিউডের তাবৎ প্লেব্যাক শিল্পীর সঙ্গে। এমনকি লড়তে হয়েছে তাকে নিজের পরিবারের সঙ্গেও। কেননা তিনি ছিলেন আরেক কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের ছোট বোন। অবশ্য সংগ্রাম তারা দুজনই শুরু করেছিলেন অনেক অল্প বয়সে। তারপর সাফল্য একসময় দুজনের কাছেই ধরা দিয়েছে।

আশা ভোঁসলের জন্ম ১৯৩৩ সালে। তখনো ভারত স্বাধীন হয়নি। বর্তমান মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলি রাজ্যের গোয়ার জনপদে তার জন্ম। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পী। তার মা শেবন্তী দীননাথ। আশার নয় বছর বয়সে মারা যান তার বাবা দীননাথ। মঙ্গেশকর পরিবারের ঠাঁই হয় বর্তমান মুম্বাইয়ে। আশা ও লতার ওপর এসে পড়েছিল পরিবারের দায়িত্ব। আশা ১০ বছর বয়সে মারাঠি সিনেমা ‘মাঝা বল’-এ প্লেব্যাক করেন। হিন্দিতে প্লেব্যাকের সুযোগ পান ১৯৪৮ সালে। একক প্লেব্যাক করেন পরের বছর ‘রাত কি রানী’ সিনেমায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে বিয়ে করেন গণপতরাও ভোঁসলেকে। তার পর থেকেই তিনি ভোঁসলে পদবি ব্যবহার করেছেন।

বলিউডের প্লেব্যাকে স্থান পাওয়া সবসময়ই কঠিন। পঞ্চাশের দশকে তা আরো কঠিন ছিল। প্লেব্যাকে সম্রাজ্ঞীর আসনে ছিলেন শমসাদ বেগম, গীতা দত্তর মতো শিল্পীরা। লতা মঙ্গেশকরও এগিয়ে যাচ্ছিলেন তরতর করে। সে সময় প্রথমে পায়ের নিচে মাটি খুঁজছিলেন আশা। তবে তার মধ্যে সম্ভাবনা খুঁজে পান সংগীত পরিচালক ওপি নায়ার। ১৯৫২ সালে ‘সাঙ্গদিল’ সিনেমায় নায়ারের সুরে গাইলেন ‘ছম ছমাছম’। পরের দুই বছর বিমল রায়ের ‘পরিণীতা’ ও রাজ কাপুরের ‘বুট পলিশ’ সিনেমায় গান দিয়ে গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকেরর কাতারেই চলে গেলেন জনপ্রিয়তা ও ইন্ডাস্ট্রির চাহিদায়। ১৯৫৭ সালে আবারো ওপি নায়ারের সঙ্গে কাজ। ‘নয়া দওড়’ সিনেমায় সাহির লুধিয়ানভির কথায় গাইলেন মোহম্মদ রফির সঙ্গে। তারপর আর থামতে হয়নি।
গোটা ষাটের দশক অন্যদের সঙ্গে আশা ভোঁসলে রাজত্ব করেছেন বলিউডে। এর মধ্যে ওপি নায়ারের সঙ্গে তার জুটি শ্রোতাদের মন কেড়েছিল। নায়ারের সুরে গান দ্রুত হয়। অনেক শিল্পীই তাল মেলাতে পারতেন না। কিন্তু আশা পেরেছিলেন। তার ক্যারিয়ারের পরবর্তী সময়েও এ প্রবণতা কাজ করেছিল।

এর পরের অধ্যায়টা তার শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে। বিজয় আনন্দের মিউজিক্যাল থ্রিলার ‘তিসরি মঞ্জিল’-এ রাহুল দেব বর্মণের সুরে গেয়েছিলেন আশা। মোহম্মদ রফির সঙ্গে ‘ও হাসিনা জুলফোওয়ালী’, ‘ও মেরি সোনা রে’, ‘আজা আজা ম্যাঁয় হু পেয়ার তেরা’ গানগুলো বলিউডের পাশাপাশি উপমহাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শ্রোতাদের মুখস্থ হয়ে যায় এসব গানের লিরিক। নির্মাতা, সুরকার, সংগীত পরিচালকরা বুঝতে পারেন বলিউডের চেনা ছকে রোমান্টিক, বিরহের গানের পাশাপাশি প্রয়োজন দ্রুতলয়ের গান, ডান্স নাম্বার, প্রেমের ও কামনার আবেদন ফুটিয়ে তোলার মতো নারীস্বর সবকিছুই ছিল আশার কণ্ঠে। ষাটের দশকের মূল্যবোধ ভাঙা ও নতুন স্টাইল তৈরির দৌড়ে আশাও অংশভাগী হলেন। রাহুল দেব বর্মণ তখন নিরীক্ষা করছিলেন আর তার সঙ্গ দিলেন আশা। এদিকে পর্দায় এলভিস প্রিসলি হয়ে উঠলেন শাম্মি কাপুর।

সত্তরের দশক বদলে দিল বাকি সব হিসাবনিকাশ। ১৯৭১ সালে ‘ক্যারাভান’ সিনেমার ‘পিয়া তু আভ তো আজা’ হয়ে গেল বাম্পার হিট। সে সময়ের আবেদন আসলে চোখে না দেখে বোঝা সম্ভব নয়। তবে ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ের আইটেম সঙ ‘শিলা কি জওয়ানি’, ‘মুন্নী বদনাম’ কিংবা ‘চিকনি চামেলি’র তুলনায় সময়ের হিসেবে আশার সত্তরের দশকের গানগুলো শ্রোতাদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি উন্মাদনা তৈরি করেছিল। সংগীত ও ইন্ডাস্ট্রির ওপরও প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। উদাহরণ দেয়া যাক, ১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া দেব আনন্দের ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ সিনেমার গান ‘দম মারো দম’ আজও জনপ্রিয়। ঊষা উত্থুপের সঙ্গে গাওয়া এ গান একটা গোটা জেনারেশনকে প্রভাবিত করেনি কেবল, বলিউডে পশ্চিমা সংগীতের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। এর প্রধান কাণ্ডারি রাহুল দেব বর্মণ হলে অংশভাগী অবশ্যই আশা ভোঁসলে। সে গতিতে সংগীতকে এগিয়ে নিলেন বাপ্পী লাহিড়ী। হিপি থেকে ডিজে, ডিস্কোয় চলে গেল ‘নমক হালাল’ সিনেমার গান।

কিন্তু এখানেই কি শেষ? একদম না। ষাটের দশকেই আশা গেয়েছিলেন ‘আভি না যাও ছোড় কার’। এমন রোমান্টিক গান আর কটা এসেছে, কিংবা গুলজারের সিনেমায় ‘মেরা কুছ সামান’-এর মতো বেদনাহত রোমান্টিক গানও ছিল তার কণ্ঠে। মুজাফফর আলীর ‘উমরাও জান’ সিনেমায় গেয়েছেন গজল। যার কণ্ঠে পশ্চিমা সুর খেলেছিল, তিনিই গেয়েছেন ‘ইন আঁখো কি মাস্তি’, ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’। নব্বইয়ের দশকে এআর রহমানের সুরে গাইলেন আশা। নতুন সুর-কাঠামোয় ‘রঙ্গিলা’র ‘তানহা তানহা’, লগানের ‘রাধা ক্যায়সে না জ্বলে’ গেয়েছেন তিনি।

কার সুর, সংগীত আয়োজনে গাননি আশা ভোঁসলে? সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্তর সুরে বাংলায় গেয়েছেন। রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছেন। তার ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’ তাড়িত করেছে কয়েকটা প্রজন্মকে। কলকাতায় নাকি এখনো পূজার প্যান্ডেল আশার কণ্ঠ ছাড়া ম্রিয়মাণ থাকে। ‘আধুনিক গান’ বলে পরিচিত ধা সেটযুগে কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ কেন, বাংলাদেশের ঘরে ঘরেও বেজেছে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ। সব জনরায়ই জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পাওয়া এ শিল্পী নিজের সাফল্যের গল্প রেখে গেছেন এ গানগুলোয়, সিনেমার পর্দায়, ক্যাসেটের এপিঠে-ওপিঠে।










