এ আলোচনাই তাদের পৌঁছে দেয় হলিউডের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। ২০২০ সালে ওটিটি জায়ান্ট নেটফ্লিক্সের সঙ্গে বহু কোটি ডলারের চুক্তি যেন তাদের নতুন জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে। তাদের লক্ষ্য ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। নিজেদের অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও গল্পকে কেন্দ্র করে একটি বৈশ্বিক কনটেন্ট সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি নেটফ্লিক্সের সঙ্গে এ দম্পতির সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। প্রশ্ন উঠছে, এখন কী করবেন তারা?

প্রথম দিকে সবকিছুই যেন পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছিল। ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’ ডকুসিরিজ নেটফ্লিক্সের ইতিহাসে অন্যতম সফল ডকুমেন্টারি হয়ে ওঠে। দর্শকসংখ্যা, আলোচনা সবদিক থেকেই এটি ছিল এক বিশাল সাফল্য। কিন্তু এ সাফল্যের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক ধরনের সীমাবদ্ধতা। এ দম্পতির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের ব্যক্তিগত গল্প, আর সেই গল্পের বাইরে তারা কতটা যেতে পারবেন, তা তখনো অনিশ্চিত ছিল।

সময়ের সঙ্গে সেই অনিশ্চয়তাই বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে। নেটফ্লিক্সের ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, হ্যারি ও মেগান বারবার একই গল্প অর্থাৎ, রাজপরিবার থেকে বেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতা—নতুনভাবে উপস্থাপন করতে থাকেন। ফলে শুরুতে যে গল্প দর্শকদের কাছে নতুন ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে একঘেয়ে হয়ে ওঠে। এ মনোভাব শুধু নেটফ্লিক্সের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পুরো হলিউডেই এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়। স্পটিফাইয়ের কর্মকর্তা বিল সিমন্স এক পর্যায়ে সরাসরি মন্তব্য করেন, ‘যতক্ষণ না আপনি রাজপরিবার নিয়ে কথা বলছেন, কেউ আপনার গল্পে আগ্রহী না।’

এর সঙ্গে আরেকটি বড় সমস্যা ছিল কনটেন্টে ধারাবাহিকতার অভাব। আর্কিওয়েল প্রডাকশনের মাধ্যমে নানা ধরনের প্রকল্পের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে খুব কমই সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। অনেক প্রকল্প মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কিছু কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। মেগানের লাইফস্টাইল শো ‘উইথ লাভ, মেগান’ প্রথমদিকে কিছুটা আগ্রহ তৈরি করলেও পরবর্তী পর্বগুলোতে সেই গতি ধরে রাখতে পারেনি।

এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে সমন্বয়ের অভাব। অপরাহ উইনফ্রের সঙ্গে বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকার কিংবা প্রিন্স হ্যারির বই ‘স্পেয়ার’ এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সময়সূচি নিয়ে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ ছিল না বলে অভিযোগ তোলে। পরবর্তী সময়ে মেগান তার লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড অ্যাজ এভারের দিকে মনোযোগ বাড়ান এবং নেটফ্লিক্সও এ উদ্যোগে যুক্ত হয়। এটি ছিল এক ধরনের পরীক্ষামূলক মডেল—যেখানে কনটেন্টের পাশাপাশি পণ্য বিক্রিও একটি বড় অংশ। কিন্তু এ উদ্যোগ প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি।

এদিকে হলিউডের ভেতরেও এ দম্পতির গ্রহণযোগ্যতা কমতে থাকে। বড় নির্মাতা বা তারকারা তাদের সঙ্গে কাজ করতে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। এ প্রেক্ষাপটে ইউটিএর প্রধান জেরেমি জিমার বলেন, ‘কেউ জনপ্রিয় হলেই তাকে মহান মনে করার মতো কিছু নেই।’ তিনি বলতে চান, খ্যাতি দিয়ে শুরু করা গেলেও টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা, ধারাবাহিকতা ও পেশাদারত্ব।

নেটফ্লিক্সের ভেতরের পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে জটিল হয়ে ওঠে। কিছু সূত্র বলছে, নেটফ্লিক্সের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। অবশ্য নেটফ্লিক্স এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে সবকিছুর মাঝেও নেটফ্লিক্সের সিইও টেড সারান্দোস এখনো আশাবাদী সুরে বলেন, ‘আমার মনে হয় সংস্কৃতির ওপর মেগানের প্রভাবকে এখনো অবহেলাভরে দেখা হচ্ছে।’

হ্যারি ও মেগানের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—তারা কি নিজেদের রাজকীয় গল্পের বাইরে গিয়ে নতুন করে দর্শকদের আকর্ষণ করতে পারবেন? নাকি সেই গল্পের সীমাবদ্ধতাই তাদের সম্ভাবনাকে আটকে রাখবে?

ভ্যারাইটি অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান