শ্রোতাদের কানে, মনে আর শহরের অলিগলিতে ‘ওয়াইল্ড মেট্রোপলিস’-এর সুর ভাসাতে ভাসাতেই ২৩ বছরে পা রেখেছে বাংলা গানের ব্যান্ড ‘মেঘদল’। ২০০২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র শিবু কুমার শীল, মেজবাউর রহমান সুমন, রাশীদ শরীফ শোয়েব, জয় প্রকাশ ও মাসুদ হাসান উজ্জ্বল—এ পাঁচজনের হাত ধরেই যাত্রা শুরু হয়েছিল দলটির। বর্তমানে তারা ছাড়াও তানবীর দাউদ রনি, এমজি কিবরিয়া, সৌরভ সরকার, আমজাদ হোসেনসহ মোট সাতজন সদস্য রয়েছেন এ ব্যান্ডে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেঘদল হয়ে উঠেছে এ শহরের আরেকটি অনুচ্চারিত ভাষা, যেখানে ক্লান্ত ট্রাফিক সিগন্যাল, মেট্রোপলিটন জীবনের একঘেয়েমি, শহরতলির বাসের অলিখিত গল্প, প্রেম ও রাজনীতির অদৃশ্য টান একাকার হয়ে আছে।
দীর্ঘ ২২ বছরের পথচলার স্মৃতিতে ফিরে তাকালে আজও আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেন মেঘদলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন। সিনেমার ব্যস্ততা সত্ত্বেও তার কাছে মেঘদল মানে এক ধরনের শিকড়ের টান। তিনি বলেন, ‘মেঘদল আমাদের বড় হয়ে ওঠার আঁতুড়ঘর। ২০০০ সালের শুরুর দিকে আমরা যখন চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র, তখনই কয়েকজন ব্যাচমেট আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের বন্ধুদের নিয়ে মেঘদল তৈরি করি। তখন গান লেখা, সুর করা, সবকিছুই ছিল আমাদের নিজেদের জন্য। দর্শক, শ্রোতা কিংবা আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে তেমন ভাবিনি। আমরা আমাদের মতো করে শহর, প্রেম আর রাজনীতির কথা বলতে চেয়েছি। সেখান থেকেই আসলে মেঘদল হয়ে উঠেছে। মেঘদল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুত্বের গল্প।’
আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকানঘেরা ছোট্ট এক অ্যানিমেশন স্টুডিও ছিল তাদের আড্ডা আর সৃষ্টির জায়গা। সেই জায়গা থেকেই ছড়িয়ে পড়েছিল মেঘদলের সুর। সুমনের ভাষায়, ‘মেঘদলের ভ্রমণটা আসলে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা আর আজিজ মার্কেট জুড়ে ছিল। তখন আমাদের সার্কেলটা অনেক বড় ছিল—১০-১২ জনের মতো। সবাই গান করত না, কিন্তু আড্ডায় থাকত। আমাদের বেড়ে ওঠার পেছনে তাদের অবদান অনেক।’
‘মেঘদল’ নামটির মধ্যেও লুকিয়ে আছে সাহিত্যিক অনুরণন। নামের উৎস জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, গায়ক ও গীতিকার শিবু কুমার শীল স্মরণ করেন শার্ল বোদলেয়ারের একটি কবিতার কথা, যার বাংলা অনুবাদ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। কবিতার নাম ‘অচেনা মানুষ’। সেখানে একটি লাইন ছিল—‘আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল।’ সেই লাইন থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে দলের নাম রাখা হয় ‘মেঘদল’।
দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে একটি ব্যান্ডকে টিকিয়ে রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ব্যান্ড আসলে একটা সংসারের মতো। গড়বে, ভাঙবে, এটাই স্বাভাবিক। এই ভাঙা-গড়ার মাঝেও কেউ কেউ টিকে থাকে। কেন টিকে থাকে, তার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। তবে নিজেদের পারস্পরিক বোঝাপড়া যত সহজ হয়, বন্ধন তত দৃঢ় হয়, এই অনুমানই করা যায়।’
সিডির যুগ পেরিয়ে ইউটিউব ও ডিজিটাল প্লাটফর্মের সময়ে গান ও ব্যান্ডের অবস্থান কেমন বদলেছে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা একটা ট্রানজিশন টাইম। আগুন আবিষ্কারের পর যেমন সভ্যতা বদলে গেছে, শিল্প বিপ্লব যেমন পৃথিবীকে পাল্টে দিয়েছে, তেমনি টেকনোলজিক্যাল রেভল্যুশন আমাদের ভাবনাবিশ্ব নাড়িয়ে দিচ্ছে। গানও মানুষের মুখ থেকে যন্ত্রে, সেখান থেকে হার্ডকপি, তারপর বাণিজ্য আর এখন স্কাইতে চলে গেছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ বদলগুলো ঘটেছে। প্রভাব তো পড়বেই। তবে দুঃখের বিষয় হলো, করপোরেশনগুলো মানুষকে বিনামূল্যে গান শোনার অভ্যাস করিয়েছে। আজকের আধুনিক বিশ্বেও শিল্পীরা তাদের ন্যায্য পাওনা পান না; তাদের লড়াই করতে হয় মনের খিদে আর পেটের খিদের জন্য একসঙ্গে।’
নিজেদের ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের ব্যান্ড কালচারের পথচলা নিয়ে আশাবাদী মেঘদল। শিবু কুমার শীল বলেন, ‘ব্যান্ড কালচার কথাটা শুনতেই ভালো লাগে। ভবিষ্যৎ অবশ্যই উজ্জ্বল। আমরা সুরের কাঙাল, গান আমাদের জীবনের বাঁকে বাঁকে থাকবেই। আমাদের সুজলা-সুফলা, নদীমাতৃক প্রকৃতি আমাদের গাইতে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে। কবিরা যেমন লিখে চলেছেন, তেমনি ব্যান্ড কিংবা যেকোনো শিল্পী তার জীবনগাথা গেয়ে যাবেন। কে তাকে থামাবে?’
বর্তমানে মেঘদলের তৃতীয় অ্যালবাম ‘অ্যালুমিনিয়ামের ডানা’ থেকে সাতটি গান এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাদের ইউটিউব চ্যানেলে। এই অ্যালবামের বাকি তিনটি গান ২০২৬ সালের শুরুর দিকেই প্রকাশিত হওয়ার কথা। আপাতত কোনো অপ্রকাশিত গান নেই, তবে নতুন গান নিয়ে কাজ চলছে, নানা পরিকল্পনাও রয়েছে।










