কিন্তু ম্যাগি ও’ফ্যারেলের কালজয়ী উপন্যাস ‘হ্যামনেট’ অবলম্বনে ক্লোয়ি ঝাও যখন সেলুলয়েডের ফিতায় নতুন এক আখ্যান বুনেছেন, সেখানে শেকসপিয়র ধরা দিয়েছেন একদম ভিন্ন এক অবয়বে। এ রূপান্তরের নেপথ্যে কেবল চিত্রনাট্য নয়, বড় ভূমিকা রেখেছে চরিত্রদের পোশাক।
কস্টিউম ডিজাইনার মালগোসিয়া তুরজানস্কা ও অভিনেতা পল মেসকাল মিলে শেকসপিয়রের যে রূপান্তর ঘটিয়েছেন, তার নেপথ্যে রয়েছে পোশাকের ‘টেক্সচার’ ও প্রতীকী রঙ। সাজসজ্জায় নেই রাজকীয় জাঁকজমক, বরং প্রতিটি দৃশ্যকল্পে পোশাকে তুলে ধরা হয়েছে এক শোকাতুর পিতার আখ্যান।
সিনেমার ভিজুয়াল ন্যারেটিভ বা দৃশ্যকাব্য তৈরি হয়েছে রঙের বিপরীতমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে। এতে শেকসপিয়রের সহধর্মিণী ‘অ্যাগনেস’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেসি বাকলি। প্রকৃতির অংশ হিসেবে চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলতে তার পরনে সবসময় দেখা যায় গাঢ় লাল ও কমলার ছোঁয়া। ডিজাইনার তুরজানস্কার মতে, অ্যাগনেস এ গল্পের ‘স্পন্দিত হৃদপিণ্ড’, তাই তার পোশাকে রাখা হয়েছে রক্তের উষ্ণতা আর জীবনীশক্তি।
অন্যদিকে পল মেসকাল অভিনীত উইলিয়াম যেন এক বিষণ্ণ দ্বীপ। তার পরনে ধূসর আর নীলরঙা পোশাকের স্তর। চারপাশের কঠিন বাস্তবতা আর শৈশবের স্মৃতি থেকে নিজেকে আড়াল করতেই যেন ধূসর কাপড়ের স্তরে নিজেকে লুকিয়ে রাখেন তিনি। অ্যাগনেসের সংস্পর্শেই কেবল সে ধূসর জীবনে কিছুটা নীলরঙা প্রাণের সঞ্চার ঘটে।
শেকসপিয়রের কোনো সমসাময়িক নিখুঁত ছবি বা শারীরিক বর্ণনা না থাকাটা নির্মাতাদের জন্য এক অর্থে শাপে বর হয়েছে। প্রথাগত রাজকীয় সাজসজ্জা বর্জন করে কেবল শেকসপিয়রের আইকনিক কানের দুলই রেখেছেন তারা। সাফল্যের সঙ্গে তার পোশাকের মান বাড়লেও আড়ম্বরতা বাড়েনি। বরং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হয়েছে আরো গাঢ় ও গম্ভীর।
শেকসপিয়রের সময়ে পুরুষদের কোমরে তলোয়ার ঝোলানোটা ছিল দস্তুর। কিন্তু মেসকাল ও তুরজানস্কা এ প্রথা ভেঙে সেখানে যুক্ত করেছেন ঐতিহাসিক অথচ বিস্মৃত অনুষঙ্গ ‘পেনার’। এটি চামড়ার তৈরি একটি বিশেষ ধারক, যার একপাশে থাকে পালকের কলম আর অন্যপাশে কালির পাত্র। মেসক্যাল চেয়েছিলেন, তার চরিত্রে যেন একজন লেখকের ছাপ স্পষ্ট থাকে। সে ছাপ ফুটিয়ে তুলতে তার হাত ও পোশাকে ব্যবহার হয়েছে ‘আয়রন গল ইঙ্ক’, যা ওক গাছের ফল থেকে তৈরি।
সিনেমায় উইলিয়ামের পরনের লেদার জ্যাকেট বা ‘জার্কিন’ তার মানসিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। সিনেমার শুরুতে তার জার্কিনে সূক্ষ্ম আঁচড়ের দাগ দেখা যায়, যা শৈশবে তার পিতার সহিংসতার স্মৃতি বহন করে। ডিজাইনার তুরজানস্কা এ লেদার জ্যাকেটে বড় বড় চির বা ‘স্ল্যাশ’ ব্যবহার করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, ঐতিহাসিকভাবে এ চিরগুলো সেলাই করে ফিনিশিং দেয়া হতো, কিন্তু এখানে তা রাখা হয়েছে একদম কাঁচা বা ‘র’। ডিজাইনারের ভাষায়, এ গভীর ছেঁড়া দাগগুলো হলো উইলিয়ামের ‘নীরব চিৎকার’। শোক আর যন্ত্রণার মুহূর্তে শেকসপিয়রের মনের ভেতর যে ভাংচুর চলেছিল, ছিঁড়ে যাওয়া লেদার জ্যাকেট তারই বহিঃপ্রকাশ।
সিনেমার সবচেয়ে জাদুকরী কস্টিউমটি দেখা যায় একদম শেষে। ‘হ্যামলেট’ নাটকের মহড়ায় শেকসপিয়র যখন তার মৃত পুত্রের স্মরণে প্রেতাত্মার চরিত্রে মঞ্চে দাঁড়ান, তখন তার পোশাকটি সবাইকে চমকে দেয়। কোরিয়ান শিল্পী নায়ুং জিয়ং-এর ‘কোকুন’ ভাস্কর্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এ পোশাক তৈরি করা হয়েছে। লিনেন কাপড়ের ওপর স্তরে স্তরে আসল কাদা মাটি দিয়ে তৈরি পোশাকটি ছিল প্রচণ্ড ভারী। মেসকাল যখন এটি পরে নড়াচড়া করতেন, কাদা মাটির স্তরে ফাটল দেখা দিত। শোকের ভারে নুয়ে পড়া এবং ভেতর থেকে ভেঙে যাওয়া এক বাবার প্রতিচ্ছবি হিসেবে এর চেয়ে শৈল্পিক আর কিছু হতে পারত না।
জিকিউ ম্যাগাজিন অবলম্বনে শামীমা ইসলাম










