এশতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি সময়। অর্থাৎ ২০০৫-০৬ সাল। বছর খানেক আগেও বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে অলিগলির সিডির দোকানে বাজত ‘সুরজ হুয়া মধ্যম’, ‘শাভা শাভা’, ‘ইটস দ্য টাইম টু ডিস্কো’, ‘জিনে কে হ্যায় চার দিন’ ইত্যাদি। কিন্তু হঠাৎই দৃশ্যপট বদলে গেল। সনু নিগমের সুরেলা কণ্ঠ, আনু মালিকের চটুল স্বর, শঙ্কর-এহসান-লয়ের তাল কেটে গেল। তথাকথিত নাকি এক কণ্ঠ এসে দখল করে নিল সব সাউন্ডবক্স। গায়কের নাম হিমেশ রেশামিয়া। সুরকারও তিনি।
২০০৫ সালে মুক্তির পর নিয়মিত বাজতে থাকল ‘আশিক বানায়া আপনে’। এ গানের দৃশ্যায়নের একটা বাজারদর ছিল সত্য কিন্তু গানের সুর ও কথাও শ্রোতা টেনেছিল। এরপর এল ‘ঝলক দিখলা যা’—যেকোনো অনুষ্ঠানে বাজত। এ দুই গানের গায়ক ও সুরকার হিমেশ রেশামিয়া এরপর একাই রাজ করেছেন বলিউডে। তারপর অনেক দিনের খরা কাটিয়ে আবার ফিরেছেন। তার ফেরাটা দেখা যায় নতুন নজরে। বলা যায় বলিউড বা যেকোনো ইন্ডাস্ট্রি ও মাজাঘষা সাংস্কৃতিক বলয়ে তিনি এক বিদ্রোহী।
হিমেশ রেশামিয়া যখন তার খ্যাতির মধ্যগগনে, তখনই তাকে নিয়ে নানা মহল সমালোচনা করত। সমালোচনার মূল বিষয় তার কণ্ঠ, গায়কি, সুর এমনকি শব্দচয়ন। তবু ২০০৫-১৪ পর্যন্ত সময়ে তিনি দিয়েছেন বহু গান। জনপ্রিয়তাই কেবল পায়নি, বহুদিন তালিকার ওপরের দিকেই ছিল। এরপর সময়ের সঙ্গে তার জনপ্রিয়তা কমেছে। অভিনয় করতে এসে জনপ্রিয়তা হারানোর পাশাপাশি ট্রলেরও শিকার হন। কিন্তু তিনি ফিরেছেন। ‘ক্যাপ ম্যানিয়া ট্যুর’ আবারো প্রমাণ করল তার জনপ্রিয়তা। একদিনের টিকিট অগ্রিম বিক্রি হওয়ার পর আবারো ডেট দিতে হয়েছে আরেকটি কনসার্টের জন্য।
হিমেশ রেশামিয়া কেবল গানের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ না। তার গানের সঙ্গে আছে আরো কিছু বিষয়। এ শতকের শুরুর দশকেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন বলিউডের তিন খান—শাহরুখ, সালমান ও আমির। তাদের প্রায় সমান্তরালেই ছিলেন হৃতিক রোশন, অক্ষয় কুমার। জন আব্রাহাম, জায়েদ খানরা সম্ভাবনা তৈরি করছিলেন। এখনকার মতো তখন একঝাঁক নতুন অভিনেতার উত্থান হয়নি। আর বলিউডে সবসময়ই সিনেমা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে গান। এমনকি দর্শক মনে করে নায়কই গান গাইছেন। ফলে অভিনেতাকে নায়কে পরিণত করার পেছনে ভূমিকা রাখে গান। ইমরান হাশমির ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল।
২০২৩ সালে মুক্তি পায় ‘টাইগার থ্রি’। সিনেমায় সালমান খানের বিপরীতে খল চরিত্রে অভিনয় করেন ইমরান হাশমি। মার্ডার, জেহের, আশিক বানায়া আপনের রোমান্টিক ছোকরা দুর্দান্ত ভিলেন। কিন্তু চিত্রনাট্য তাকে যথেষ্ট সময় ও সুযোগ দেয়নি। সালমান খানই স্ক্রিন দখল করে রেখেছিলেন। আর মানুষের মনে বারবার ফিরেছে ইমরানের রোমান্টিক মেজাজ। মজার বিষয় এ মেজাজ বা আবহ তৈরির পেছনে অবদান আছে হিমেশের। ২০০৩ সালে বিক্রম ভাটের ‘ফুটপাথ’ দিয়ে অভিষেক হলেও অনুরাগ বসুর ‘মার্ডার’ দিয়ে নজরে আসেন ইমরান। সেখানে কুণাল গাঞ্জাওয়ারার কণ্ঠে ‘ভিগে হোঠ’, জেহের সিনেমায় আতিফের গলায় ‘ওহ লামহে’ জনপ্রিয় হলেও ‘আশিক বানায়া আপনে’র আবেদন ছিল অন্য রকম। এখনো আছে। এরপর আসে ‘ঝলক দিখলা যা’। একটা সময় ‘ছাইয়া ছাইয়া’র যে জনপ্রিয়তা ছিল সে জায়গাই দখল করে গানটি।
‘আশিক বানায়া আপনে’র জন্য ফিল্মফেয়ার, আইফা ও জি সিনে অ্যাওয়ার্ডস পেয়েছিলেন হিমেশ। ‘তেরে নাম’ সিনেমারও সংগীত তার করা। এজন্যও পুরস্কৃত হন। ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আপ কা সুরুর—দি অ্যালবাম’ বিক্রি হয়েছিল ৫ কোটি ৫০ লাখ কপি। সেই হিমেশের গানকে এর কিছুদিন পরই বলা হলো ‘অটোরিকশাচালকদের গান’, ‘নাইট ক্লাবের গান’। এদিকে বলিউডে জনপ্রিয় হতে শুরু করলেন সাজিদ-ওয়াজিদ, বিশাল-শেখর, প্রীতম প্রমুখ। পুরনোরা তো ছিলেনই। গায়কদের মধ্যে সনু নিগম, উদিত নারায়ণ, কেকে, আতিফ আসলাম, রাহাত ফতেহ আলী খান, শাফকাত আমানত আলী খানদের কণ্ঠ, গায়কি, গানের কথা ও সংগীতায়োজনের ভিড়ে এক কোণে পড়ে যান হিমেশ। একসময় সত্যিই তিনি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সংগীতকার ও গায়কে পরিণত হন।
কিন্তু হিমেশ হাল ছাড়েননি। পাশাপাশি তার বিদ্রোহের জায়গাটা হলো তিনি নিজস্বতা বর্জন করেননি। যেকোনো ইন্ডাস্ট্রিতেই টিকে থাকার জন্য শিল্পীরা অনেক সময়ই নিজস্বতা বাদ দেন। ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা অনুসারে বদলে নেয় নিজেকে। হিমেশ তার জনপ্রিয়তা হারানোর ১০-১২ বছর পরও ক্যাপ মাথায়, উল্লম্ব করে মাউথপিস ধরে সেই নাকি সুরেই গাইলেন, যেমনটা তিনি গাইতেন ২০ বছর আগে। আর তার সঙ্গে গলা ফাটিয়ে ‘ঝলক দিখলা যা’ গাইল হাজারো দর্শক। হিমেশ নিজের প্রতি সৎ থেকেছেন বলেই হয়তো তিনি মাজাঘষা সাংস্কৃতিক বলয়ে এক বিদ্রোহী।










