সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিড স্ক্রল করলেই বারবার চোখে পড়ছে পাকিস্তানের তরুণ অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ার সিদ্দিকীর মুখ। ভক্ত অনুরাগীরা তার বর্তমান একটা সিরিয়ালের ক্লিপ শেয়ার করছেন। নাম, সুঅভিনয়, সুর্দশন চেহারা ছাপিয়ে শেহরিয়ার মুনাওয়ার হয়ে উঠেছেন একজন আদর্শ স্বামী—‘আবু বকর’। বিশেষত নারী ভক্তরা রীতিমতো আবু বকর জ্বরে ভুগছে।
পাকিস্তানি জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘দার-ই-নিজাত’-এর এ কাল্পনিক চরিত্রটি ঝড়ের গতিতে জয় করে নিয়েছে বাংলাদেশসহ পুরো উপমহাদেশের নারী দর্শকদের মন। কারো মতে তিনি বর্তমানের ‘জাতীয় ক্রাশ’, আবার কেউ কেউ রসিকতা করে বলছেন—বাস্তব জীবনে এমন একজন পুরুষকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া রীতিমতো লটারি জেতার শামিল! রাতারাতি একটি নাটকের চরিত্র কীভাবে উপমহাদেশীয় নারীদের এমন ঘোর ও গণ-উন্মাদনায় পরিণত হলো, তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা।
নাটকটিতে আবু বকরের স্ত্রী জারিয়াব চরিত্রে অভিনয় করেছেন দুরে ফিশান সেলিম। কথাসাহিত্যিক উমেরা আহমেদের লেখায় ও সাকিব খানের পরিচালনায় নির্মিত ধারাবাহিকটির মূল আকর্ষণ তাদের সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন। দর্শকদের কাছে আবু বকরকে আলাদা করে তুলেছে তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। পর্দায় তাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত শান্ত, ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল একজন মানুষ হিসেবে। অন্যের ভুল সহজে ক্ষমা করে দেয়া, পরিস্থিতি বুঝে কথা বলা এবং চরম সংকটময় মুহূর্তেও নিজের মেজাজ ও আচরণে সংযম বজায় রাখা—এ গুণগুলোই তাকে নারীদের স্বপ্নের পুরুষে পরিণত করেছে। এ ইতিবাচক রূপায়ণের কারণেই নাটকটির বিভিন্ন আবেগঘন দৃশ্য ও ক্লিপ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, রিলস ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়েছে।
আবু বকরের এ তুমুল জনপ্রিয়তার নেপথ্যে আরেকটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে জারিয়াবের অতীত প্রেমিক জামিল চরিত্রটি। পর্দায় জামিলের বিষাক্ত মনোভাব, সুযোগসন্ধানী আচরণ, স্বার্থপরতা আর প্রতারণা দর্শকদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ সম্পর্কগুলোয় পুরুষরা যেমন আবেগীয় ব্ল্যাকমেইল বা অহংবোধ দেখায়, জামিল তারই জীবন্ত প্রতীক।
জামিলের ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে আবু বকর চরিত্রটি। অতীত জেনেও কোনো অভিযোগ বা খোঁটা ছাড়াই স্ত্রীকে গ্রহণ করেছে পরিপূর্ণ প্রেমে। স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা ও তাকে নিঃশর্ত সুরক্ষার চাদরে ঢেকে রাখার বিষয়টিই নারী ভক্তদের মনে দাগ কেটেছে। জামিলের দেয়া গভীর মানসিক ক্ষত ও প্রতারণার বিপরীতে আবু বকরের অটল সম্মান আর ভালোবাসাই নারী হৃদয়ে মলমের মতো প্রলেপ লাগিয়েছে।
ফেসবুক গ্রুপ থেকে শুরু করে ইনস্টাগ্রাম রিলসে নারীদের ওয়ালে এখন শুধুই আবু বকর চর্চা। অনেক নারী নির্দ্বিধায় পোস্ট করছেন—‘পুরুষদের শেখা উচিত কীভাবে স্ত্রীর যত্ন নিতে হয়, যেমনটা আবু বকর নেয়।’ কেউ কেউ হাসির ছলে নিজের স্বামীকে ট্যাগ করে লিখছেন—‘আবু বকরের ভিডিওগুলো অন্তত ১০ বার দেখো!’ মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সম্পর্কের টানাটানি, সন্দেহ আর বিষাক্ততার ভিড়ে আবু বকরের মতো একজন সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধাশীল পুরুষের উপস্থিতি নারীদের সুপ্ত মানসিক প্রত্যাশাকে স্পর্শ করেছে।
তবে এত উন্মাদনার মধ্যেও ভক্তদের একটি পক্ষ মনে করছে আবু বকরের মতো নিখুঁত মানুষের অস্তিত্ব বাস্তবে নেই। কেউ কেউ চরিত্রটিকে অতিরিক্ত আদর্শ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এ সমালোচনার জবাব দিয়েছেন নাটকের লেখক উমেরা আহমেদ। পাল্টা প্রশ্ন রেখে তিনি বলেছেন, দয়া, সহমর্মিতা ও ক্ষমার মতো স্বাভাবিক মানবিক গুণগুলো আজ কেন এত অস্বাভাবিক মনে হবে? সমাজে কি তবে এই গুণগুলোর চর্চা এতটাই কমে গেছে যে আবু বকর চরিত্রটি দর্শকদের কাছে অবাস্তব ঠেকছে?
দর্শকদের চোখে চরিত্রটি যতই নিখুঁত হোক না কেন, খোদ অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ার মনে করেন আবু বকর ত্রুটিমুক্ত নয়। বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আবু বকর মূলত একজন ‘পিপল প্লিজার’। অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে সে প্রায়ই নিজের ইচ্ছা ও চাহিদাকে কোণঠাসা করে ফেলে, এমনকি কাউকে ‘না’ বলতে তার তীব্র জড়তা কাজ করে। পাশাপাশি তার মধ্যে রয়েছে ‘সেভিয়ার কমপ্লেক্স’ বা অন্যকে উদ্ধার বা রক্ষা করার অতিরিক্ত মানসিক তাগিদ। তার ব্যক্তিগত জীবনও অনেকটা এরকমই। শেহরিয়ারের মতে, চরিত্রটির মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো তার পারিবারিক শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার ফল।
বাংলাদেশের দর্শকদের এমন আবেগের বিষয়টি নজর এড়ায়নি দেশের তারকাদেরও। সম্প্রতি উপস্থাপক ও অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবু বকরকে নিয়ে লেখেন, ‘পাকিস্তানের নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র আবু বকরকে ঢাকার রাস্তায় ছেড়ে দিলে তার ধৈর্য ও ভালো হওয়ার আসল পরীক্ষা হয়ে যেত। ক্যামেরার সামনে ভালোর অভিনয় করাই যায়, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’ জয়ের এই মন্তব্যটি নিয়ে নেটদুনিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। ঢাকার রিকশা, যানজট ও দৈনন্দিন যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গে আবু বকরের অটল ধৈর্যের তুলনা অনেকেই বেশ উপভোগ করেছেন।










