অভিনয়গুণে তো পরিচিতই তিনি। তবে তার কথায়ও মুগ্ধ হয়েছে মানুষ। উপস্থিত বুদ্ধিতে তার জুড়ি মেলা ভার। প্রেস কনফারেন্স হোক বা একান্ত সাক্ষাৎকার; বুদ্ধি ও জ্ঞানের দীপ্তিতে অনন্য শাহরুখ খান। অবশ্য প্রায় ৮ বছর হতে চলল খুব বেশি সাক্ষাৎকার দেননি। তবু পুরনো সাক্ষাৎকারের ক্লিপ এখনো ভেসে বেড়ায় ইন্টারনেটে।
সম্প্রতি শাহরুখ খানের জন্মদিনে তাকে নিয়ে অনেকেই স্মৃতিচারণ করছেন। এর মধ্যে মোহর বসু গুরুত্ব দিয়েছেন কথার জাদুকর শাহরুখ প্রসঙ্গে। ‘শাহরুখ খান: লেজেন্ড, আইকন, স্টার’ বইয়ের লেখক স্ক্রিনকে বলেন, ‘শাহরুখ তার ক্যারিয়ারে এত বেশি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন যে সেগুলোর কখনো অভাব হবে না। মেজাজ যেমনই হোক, দেখার মতো একটি শাহরুখ-সাক্ষাৎকার ঠিকই খুঁজে পাওয়া যাবে।’
মোহরের মতে, শাহরুখের চিন্তাশীল কথোপকথনের জন্য রয়েছে ২০১২ সালে তেহেলকার সঙ্গে সাক্ষাৎকার, ব্যক্তিগত আলাপের জন্য ২০১৯ সালে ডেভিড লেটারম্যানের অনুষ্ঠান এবং রসিক শাহরুখকে দেখতে কফি উইদ করণ কিংবা ২০১৭ সালে অল ইন্ডিয়া বাকচোদ (এআইবি)-এর সঙ্গে করা দুই পর্বের পডকাস্ট।
সেসব কথোপকথনে শাহরুখের বিশেষত্ব ছিল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি প্রশ্নের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তার আন্তর্জাতিক জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা মান্দভি শর্মা বলেন, ‘তিনি কেবল প্রশ্নের উত্তর দেন না, প্রশ্নের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এক মুহূর্তে আপনাকে হাসাতে পারেন, পরের মুহূর্তেই ভাবনায় ফেলে দিতে পারেন। আবার কখনো এমন ব্যক্তিগত কিছু বলে বসেন, যা আপনাকে অবাক করে।’
সাক্ষাৎকারে শাহরুখের স্বতঃস্ফূর্ত রূপের কথা স্মরণ করেন লেখক ও সাংবাদিক অনুপমা চোপড়া। ‘কিং অব বলিউড’ (২০০৭) বইয়ের লেখক বলেন, ১৯৯৫ সালে রাম জানে সিনেমার সেটে প্রথম সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ই শাহরুখের রসবোধ তাকে মুগ্ধ করেছিল। নিজের অভিনয় নিয়ে সমালোচনার জবাবে শাহরুখ বলেছিলেন, লোকে বলে তার মুখে পাচ রকম অভিব্যক্তি দেখা যায়। এটা ভালো, কারণ অন্যদের মুখে নাকি মাত্র তিন রকম অভিব্যক্তি দেখা যায়!
নয় বছর আগে নেওয়া সর্বশেষ সাক্ষাৎকারটির স্মৃতিও অনুপমার কাছে বিশেষ। যাব হ্যারি মেট সেজাল সিনেমার প্রচারণার সময় বান্দ্রার মেহবুব স্টুডিওতে শাহরুখ ও আনুশকা শর্মার সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন তিনি। মাঝখানে একটি পথকুকুরের ঘেউ ঘেউয়ে বিঘ্ন ঘটলে শাহরুখও কুকুরটির দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করে ওঠেন। অনুপমার ভাষায়, ঘটনাটি ছিল ভীষণ মজার।

অনুপমা চোপড়ার সঙ্গে শাহরুখ খান
তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে পরিস্থিতি। জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজরদারি এবং অনলাইন কনটেন্টের বিস্ফোরণের কারণে শাহরুখের মতো অনেক তারকাই সাক্ষাৎকার দেওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। মোহার বসুর মতে, ‘এখন সময়টা ভয়াবহ। প্রায় প্রত্যেক অভিনেতা ও নির্মাতাই সাক্ষাৎকারে খুব সতর্ক থাকেন, আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে আসেন। এমনকি প্রশ্নও আগে থেকে জানতে চান। কখনো কখনো এসব সাক্ষাৎকারের কোনো অর্থ খুঁজে পাই না।’
২০০৪ সালে শাহরুখের অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ নিয়ে দুই পর্বের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন নাসরিন মুন্নি কবির। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শাহরুখের সাক্ষাৎকার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, ‘তখন হয়তো তিনজন গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক ছিলেন। এখন অন্তত ৫৫ জন। আমি যদি শাহরুখ হতাম তাহলে এখন আমিও কাউকে সাক্ষাৎকার দিতাম না। কয়েকজনকে সাক্ষাৎকার দিয়ে বাকিদের বঞ্চিত করার চেয়ে কাউকেই না দেওয়া ভালো।’
নাসরিনের মতে, সাক্ষাৎকার না পাওয়ায় মূলত গণমাধ্যমই শাহরুখকে বেশি মিস করছে। কারণ ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তাঁর এখন এক্স (সাবেক টুইটার) রয়েছে। #AskSRK পর্বে সরাসরি ভক্তদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। আর মানুষও বিস্তারে আগ্রহী না। নাসরিন বলেন, ‘শাহরুখকে নিয়ে আরেকটি বই পড়তে কেউ খুব একটা আগ্রহী নন। মানুষ জানতে চায়, ১৫ মিনিট আগে তিনি কী করছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।’

এআইবির পডকাস্টে
সাক্ষাৎকারে না থাকলেও ক্লিকবেইট ও আলোচনায় ঠিকই আছেন শাহরুখ। মান্দভি শর্মার মতে, একসময় অর্থবহ কথোপকথনের জায়গা দখল করে নিয়েছে ক্লিকবেইট ও চটকদার শিরোনাম। মানুষের জীবনের গল্প জানার বদলে এখন এমন শিরোনাম তৈরির প্রতিযোগিতা চলে, যা সবচেয়ে বেশি পাঠক বা দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। তার ভাষায়, ‘আজকের সময়ে শাহরুখ খানের মতো সাক্ষাৎকারের অভাব রয়েছে। তবে একই সঙ্গে এমন গণমাধ্যম ও প্ল্যাটফর্মেরও অভাব রয়েছে, যাদের ধৈর্য, কৌতূহল এবং সম্পাদকীয় গভীরতা আছে এ ধরনের কথোপকথনকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার।’
এই পরিস্থিতিতে অমিতাভ বচ্চনও ভক্তদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য নিজের ব্লগকে বেছে নিয়েছেন। সম্প্রতি এক পোস্টে তিনি বলেছেন, সংবাদমাধ্যম তাঁর সম্পর্কে লেখা বন্ধ করে দিলেও তাতে বিশেষ কিছু এসে যাবে না। তার ভাষায়, ‘আমার সংবাদ এখন এখানেই থাকবে।’
শাহরুখের সাক্ষাৎকার না দেওয়াকে অবশ্য বৃহত্তর গণমাধ্যম পরিস্থিতির ফল হিসেবে দেখতে চান না অনুপমা চোপড়া। তার মতে, শাহরুখ বরাবরই ব্যতিক্রমী। তিনি যখন সাক্ষাৎকার দিতে চান না, তখন তার কাছ থেকে সাক্ষাৎকার পাওয়ার চেষ্টা অর্থহীন।
তবে শাহরুখের এই অনুপস্থিতি নতুন প্রজন্মের তারকাদের মধ্যেও প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই মনে করছেন, সাক্ষাৎকার এড়িয়ে চললে তাদের ব্র্যান্ড ইমেজ আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু মোহর বসু মনে করেন, তারা শাহরুখের সাফল্যের মূল জায়গাটি বুঝতে পারছেন না। শাহরুখ সাক্ষাৎকার না দিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন না। বছরের পর বছর নিজের জীবন, চিন্তাভাবনা, মতামত ও স্মৃতির কথা মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন বলেই বিশ্বজুড়ে ভালোবাসা অর্জন করেছেন। মোহারের প্রশ্ন, ‘মানুষ যদি আপনাকে না-ই চেনে, তাহলে আপনাকে ভালোবাসবে কীভাবে?’

কফি উইদ করণে কারলের সঙ্গে
মান্দভির মতে, ‘ব্র্যান্ড এসআরকে’-এর অন্যতম শক্তি তার অকৃত্রিম ব্যক্তিত্ব। দেশের অন্যতম বড় সুপারস্টার হয়েও কথোপকথনে তিনি মানবিক দিকটি হারিয়ে ফেলেন না। তার ভাষায়, ‘তিনি সৎ, আন্তরিক, স্বতঃস্ফূর্ত এবং নিজের মতো করেই থাকতে ভালোবাসেন। গণমাধ্যমের সামনে কীভাবে কথা বলতে হবে, সে বিষয়ে যত প্রশিক্ষণই দেওয়া হোক না কেন, এই অকৃত্রিমতা তৈরি করা সম্ভব নয়।’
শাহরুখের জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে ভক্তরাও নিজেদের যুক্ত মনে করেন। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক কোনো প্রচারণা দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন মান্দভি।
২০২৩ সালে সিএনএন-নিউজ১৮-এর ‘ইন্ডিয়ান অব দ্য ইয়ার’ সম্মাননা গ্রহণের সময় শাহরুখ জীবনের কঠিন একটি সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। ধারণা করা হয়, বড় ছেলে আরিয়ান খানের গ্রেপ্তারের ঘটনাটির দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন তিনি। শাহরুখ বলেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, ‘চুপ থাকো, খুব চুপ থাকো এবং মর্যাদা ধরে রেখে কঠোর পরিশ্রম করে যাও। যখন মনে হবে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, তখনই হঠাৎ কোথা থেকে জীবন এসে তোমাকে আঘাত করবে।’

‘রা ওয়ান’-এর প্রিমিয়ারে লন্ডনে। ছবি: রয়টার্স/অলিভিয়া হ্যারিস
দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থেকে শাহরুখের দূরে থাকা তার ভক্তদের ভালোবাসায় অবশ্য ভাটা ফেলেনি। মান্দভির মতে, ‘দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থেকে শাহরুখের দূরে সরে থাকা মানুষকে বুঝতে সাহায্য করেছে, কথোপকথনের জগতে তিনি কতটা মূল্যবান ছিলেন। কখনো কখনো কোনো কণ্ঠস্বর কতটা স্বতন্ত্র, তা বোঝা যায় তখনই, যখন সেই কণ্ঠস্বর আর সহজে শোনা যায় না।’
মোহারের প্রত্যাশা, শাহরুখ আবার দীর্ঘ কোনো সাক্ষাৎকারে ফিরবেন। তার কথায়, ‘আশা করি, তিনি আবার কখনো দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেবেন। আমরা সবাই সেটির জন্য অপেক্ষা করব। এক্সে প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে আর মন ভরছে না।’
অনুপমা চোপড়ারও একই প্রত্যাশা। তিনি চান, অবসর নেওয়ার আগে শাহরুখ তাকে আর একবার সাক্ষাৎকার দেওয়ার সুযোগ দিন। তার ভাষায়, ‘অবসর নেওয়ার আগে শাহরুখ যদি আমাকে আর একবার সাক্ষাৎকার দেওয়ার সুযোগ দেন, সেটুকুই চাই। তারপর শান্তিতে অবসর নিতে পারব।’
[দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে]










