বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকা নুসরাত ফারিয়াকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত রোববার গ্রেফতার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। থাইল্যান্ড যাওয়ার সময় বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। নুসরাত ফারিয়ার বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় করা একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ওই মামলায় তাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আসামি করা হয়।

গতকাল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

নুসরাত ফারিয়ার গ্রেফতারের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন শোবিজ তারকারা।

গতকাল বেলা ১১টা ১২ মিনিটে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেন, ‘আমি সাধারণত চেষ্টা করি আমার মন্ত্রণালয়ের কাজের বাইরে কথা না বলতে। কিন্তু আমার তো একটা পরিচয় আছে, আমি এ ইন্ডাস্ট্রিরই মানুষ ছিলাম এবং দুইদিন পর সেখানেই ফিরে যাব। নুসরাত ফারিয়ার গ্রেফতার বিব্রতকর একটা ঘটনা হয়ে থাকল আমাদের জন্য। আমাদের সরকারের কাজ জুলাইয়ের প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা। ঢালাও মামলার ক্ষেত্রে আমাদের পরিষ্কার অবস্থান প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টতা না থাকলে কাউকে গ্রেফতার করা হবে না এবং সে নীতিই অনুসরণ করা হচ্ছিল।

ফারিয়ার বিরুদ্ধে এ মামলা তো অনেক দিন ধরেই ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে গ্রেফতারের কোনো উদ্যোগ নেয়ার বিষয় আমার নজরে আসেনি। কিন্তু এয়ারপোর্টে যাওয়ার পরই ঘটনাটা ঘটে। আওয়ামী লীগের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিদেশ গমনকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের পর ওভার নারভাসনেস থেকেই হয়তোবা এসব ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

কয়দিন আগে ব্যারিস্টার আন্দালিব পার্থের স্ত্রীর সঙ্গেও এ রকম একটা ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য না। আমি বিশ্বাস করি ফারিয়া আইনি প্রতিকার পাবে এবং এ ধরনের ঢালাও মামলাকে আমরা আরো সংবেদনশীলভাবে হ্যান্ডেল করতে পারব—এ আশা। মনে রাখতে হবে আমাদের প্রধান কাজ জুলাইয়ের প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা।’

পরিচালক শিহাব শাহীন লিখেছেন, ‘অবিশ্বাস্য এক আজগুবি মামলায় নুসরাত ফারিয়ার গ্রেফতার হয়রানিমূলক।’ সেখানে একজন মন্তব্য করেছেন, ‘স্বৈরাচারের দোসরদের মধ্যে অন্যতম একজন নুসরাত ফারিয়া।’ তার উত্তরে এ পরিচালক লিখেছেন, ‘একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দোসর হয়ে গেল।’

নুসরাত ফারিয়ার গ্রেফতারকে নাটক বলে মনে করছেন নির্মাতা আশফাক নিপুণ।

গতকাল ফেসবুকে নিপুণ লিখেছেন, ‘এভাবেই দিনে দিনে প্রকৃত খুনি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দুর্বল করতে অন্যদের সফট টার্গেট করা হয়ে আসছিল এবং করা হচ্ছে। এটাকে আর যা-ই হোক, সংস্কার বলে না সরকার। হত্যাচেষ্টার যে মামলা করা হলো এবং যে হত্যার সময় তিনি দেশেই ছিলেন না, সে অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেফতার এবং কারাগারে প্রেরণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে ইঙ্গিতই দেয়।’

সবশেষে লিখেছেন, ‘আমরা জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু বিচার চেয়েছিলাম। কোনো রকম প্রহসন চাইনি, এখনো চাই না। চিহ্নিত অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়া বা পালাতে দেয়া এবং ঢালাও গায়েবি মামলাবাজির নাটক বন্ধ করেন।’

অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনও তার ফেসবুক স্টেটাসের মাধ্যমে জানিয়েছেন প্রতিবাদ ।

গতকাল সকালে এক ফেসবুক পোস্টে বাঁধন লিখেছেন, ‘এ মেয়ের কোনো দোষ নেই। সে মোটেই দায়ী নয়। যারা ফ্যাসিবাদী শাসন চালিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে, তাদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।’

অভিনেত্রী আরো লিখেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি ও ব্যবস্থা নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা এমন দেশে বাস করি না, যেখানে ন্যায়বিচার সাধারণভাবে প্রচলিত। তবে এবারের ঘটনাটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

এ ঘটনায় ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা খায়রুল বাসার সামাজিক মাধ্যমে নুসরাত ফারিয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, ‘তিনি অভিনেত্রী, তার কাজ হলো অভিনয় করা। যেকোনো গল্পে যে চরিত্র পাবেন, তার যথাযথ প্রকাশ তিনি করবেন, এটাই তার কাজ।’ খায়রুল বাসার আরো উল্লেখ করেছেন, ‘আমার ধারণা তিনি রাজনীতি সচেতনও না এবং কোনো রাজনীতি করেনও না, এমনকি বিটিভিতে গিয়ে মায়া কান্নাও করেননি। তাহলে একটা সিনেমায় অভিনয় করাকে কেন্দ্র করে কেন এ হেনস্তা? ওই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সবাইকেই অডিশনের জন্য ডাকা হয়েছিল, অনেকেই অডিশন দিয়েছেন। যারা সিলেক্ট হয়েছেন, তারাই অভিনয় করেছেন। এটাম সিম্পল! এখানে কেউ রাজনীতি করতে যাননি।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘অভিনেত্রী হিসেবে একটা সিনেমায় অভিনয় করা কি কোনো অপরাধ? যদি তাই হয়, তবে নুসরাত ফারিয়ার সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে।’ এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, ‘বর্তমান সরকার যদি শিল্পীদের কোনো রাষ্ট্রীয় আয়োজনে ডাকেন, তখন শিল্পীদের করণীয় কী হবে? পরবর্তী সরকার যদি তাদের হেনস্তা করে, তাহলে কি তারা হুকুমের দাস হয়ে যাবেন? নাকি শিল্পীরা কখনই কোনো সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রীয় আয়োজনের অংশ হবে না?’