ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহি। সিনেমার খোঁজখবর যারা রাখেন, তাদের কাছে তিনি এক নামে পরিচিত। ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন তিনি সবসময়। এ ক্ষমতা মানে তার দেশের সরকার। ইরান সরকার সবসময়ই মুক্ত মতের প্রতি খড়্গহস্ত হয়েছে। জাফর পানাহি, মোহাম্মদ রসুলফ, অভিনেত্রী তারানেহ আলীদুস্তি শিকার হয়েছেন সরকারের রোষের। ২০১০ সালে রসুলফের ওপর দেশবিরোধী প্রপাগাণ্ডা চালানোর অভিযোগ আনা হয়। তার সিনেমা নির্মাণেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু তার পরও সিনেমা নির্মাণ করেছেন জাফর পানাহি। আইফোন ব্যবহার করে সিনেমা নির্মাণ করেছেন। নিজে হয়েছেন সিনেমার মূল চরিত্র কিন্তু সিনেমা নির্মাণ বন্ধ করেননি। কান চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি এবার জিতেছেন স্বর্ণপাম।

27

১৯৯৫ সালে জাফর পানাহি নির্মিত ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ মুক্তি পায়। এটা তার অভিষেক সিনেমা ছিল। সিনেমাটিতে সাত বছর বয়সী রাজিয়ার গল্প জানা যায়। নতুন বছরের শুরুতে সে মায়ের কাছে বায়না করে একটা গোল্ডফিশ কেনার। মা তাকে টাকা দিলে পথে সে নানাভাবে সে টাকা খরচ করে ফেলে। ইরানের আরেক কিংবদন্তি নির্মাতা আব্বার কিয়ারোস্তমি লিখেছিলেন এ গল্প। পানাহি একসময় তার সহকারী ছিলেন। দুজন মিলে একটা মানবিক গল্প বলেছিলেন এ সিনেমায় যেখানে আমাদের রোজকার জীবন, যাপন ও মানুষের গল্প দেখা যায়। সিনেমাটি ওই বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে ক্যামেরা ডি’অর পুরস্কার পেয়েছিল। শুরুটা ভালো হয়েছিল জাফর পানাহির।

তার সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘অফসাইড’ও আলোচিত। ইরানের নারীদের এক ধরনের চাপের মধ্যে থাকতে হয়, তা সবারই জানা। জাফর তার এ সিনেমা নির্মাণ করেছিলেন নারী ফুটবলারদের নিয়ে। একটা সত্যিকার ম্যাচের মধ্যেই সিনেমাটির শুট করেছিলেন তিনি। এটাকে ফিকশন ও মেটা ফিকশনের মাঝামাঝি একটা সিনেমা বলে মনে করেন সমালোচকরা। মূলত ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমার কারণেই পানাহির প্রতি ইরান সরকারের বিরূপ মনোভাব তৈরি হতে শুরু করে। তিনি ইরানের বাস্তবতা সিনেমায় নিয়ে এসেছিলেন। দ্য হোয়াইট বেলুনের মতো সিনেমাটি সহজ ছিল না। ফলে তা নিয়ে নানা মহলে আলাপ শুরু হয় এবং পানাহি নজরদারিতে চলে আসেন।

28

২০১০ সালে পানাহির ওপর দেশবিরোধী প্রপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগ আনে ইরান। কিন্তু এর মধ্যেই তার সিনেমা নির্মাণ চলতে থাকে। ২০১১ সালে মুক্তি পায় ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’। সিনেমাটির সঙ্গে ১৯২৯ সালে রেনে মার্গারিটের ট্রেচারি অব ইমেজেস চিত্রকর্মের তুলনা করা হয়। সিনেমাটিতে পানাহি মূলত বেশকিছু আইডিয়াকে একত্র করেছিলেন। দর্শন আর রাজনীতিকে তিনি এক জায়গায় এনে মিলিয়ে দিয়েছিলেন আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সিনেমাটিক এক যাত্রা। নির্মাতার সৃষ্টি ও দর্শনের সঙ্গে সেন্সরশিপের একটা দ্বন্দ্ব সবসময়ই থাকে। জাফর পানাহি তার ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’-এ বিষয়গুলোর সমস্যা ও সম্ভাবনা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ন্যারেটিভ ও ভিজুয়াল নিয়েও তিনি নিরীক্ষার চেষ্টা করেছেন।

29

পানাহির আলোচিত সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘ট্যাক্সি’ অন্যতম। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমায় নিজের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জাফর। সিনেমার গল্প এমন যে তিনি নিজের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে তেহরানের রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। সিনেমা নির্মাণের স্বাধীনতা ও তার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছেন ট্যাক্সিতে। সমালোচকদের অনেকে এ সিনেমাকে লোকশিল্প বলে উল্লেখ করেছেন। আবার জীবনের এক টুকরো বলেও মনে করা যায়। ড্যাশবোর্ডে রাখা ক্যামেরা যে সময় মানুষ, তেহরান ও পানাহিকে ধরতে থাকে তখন এ সিনেমা ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’-এর তুলনায় আরো বেশি প্রবেশ করে মেটা ফিকশনের দিকে। ক্যামেরা যে দুনিয়ার ওপর একটা প্রভাব রাখে, তা জাফর পানাহি এ সিনেমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

বার্লিনে ২০০৬ সালে গোল্ডেন বিয়ার পেয়েছিলেন তিনি। এ বছর কান উৎসবে পেলেন স্বর্ণপাম। ‘ইট ওয়াজ নট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ সিনেমার জন্য কানে পুরস্কৃত হলেন জাফর পানাহি। এ সিনেমায় এক নির্যাতিতের গল্প বলেছেন তিনি। সে তার নির্যাতনকারীকে খুঁজে বেড়ায়। মূলত পানাহির সিনেমায় সবসময়ই এ ধরনের কিছু মৌল বিষয় ছিল। তার ‘নো বিয়ারস’, ‘ট্যাক্সি’, ‘ক্লোজড কার্টেইন’ এ ধারার সিনেমা এবং সমালোচকদের মধ্যে বেশি আলোচিত। সে তুলনায় ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য সার্কেল’ তুলনামূলক সহজ বলেই হয়তো কম আলোচিত। এ সিনেমায় ইরানের নারীদের সীমাবদ্ধ করে রাখার বাস্তবতা তুলে ধরেছেন তিনি।

মূলত, পানাহি তার সিনেমাগুলো নিছক গল্প বলার জন্য নির্মাণ করেননি। কখনো তা প্রতিবাদের স্বর ছিল আর কখনো তা হয়ে উঠেছিল সিনেমার সুর।