বটতলার নন্দিত প্রযোজনা খনা। নির্দেশনা দিয়েছেন মোহাম্মদ আলী হায়দার। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাটকটির ৯৯তম মঞ্চায়ন হবে আজ।
খনার গল্পটা পনেরশ বছর আগের হলেও আজও প্রাসঙ্গিক। ঘরের বাইরে পা ফেলা নারীর প্রথম বাধা ঘরের ভেতর থেকেই আসে, খনা নাটকটি সেই গল্পই বলে। চরিত্রটি তার জীবনের নানা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে এক অন্য সত্যের মুখে দাঁড় করান দর্শককে।
খনা এক বিদূষী কন্যা। তার আরেক নাম লীলাবতী। এ বিদুষীর গল্প বহু কিংবদন্তির ঘেরাটোপে বন্দি। তবু যেটুকুর তল খুঁজে পাওয়া যায় তাতে বোধ হয়, তিনি এক বিদুষী জ্যোতিষী। তার স্বামী মিহিরও একই বৃত্তিধারী। শ্বশুর যশস্বী জ্যোতিষী বরাহ মিহির। পুত্রজায়ার যশ, খ্যাতি ও বিদ্যার প্রভাব সন্দর্শনে বরাহের হীনম্মন্যতা ও ঈর্ষা হয়। পুরুষের এ ঈর্ষাটুকু বোঝা ততটা কঠিন নয়। কঠিন থাকেওনি। শ্বশুরের নির্দেশে লীলাবতীর জিহ্বা কর্তন ও তার খনা হয়ে ওঠার গল্প পেরিয়েছে প্রজন্মের সীমানা। তাই একবিংশ শতকেও হাতরে বেড়ানো হয় খনার বচন। এ নাটকের কাহিনী এগিয়েছে চন্দ্রকেতু গড়কে কেন্দ্র করে, যেখানে আজও আছে খনা-মিহিরের ঢিবি। লঙ্কাদ্বীপ থেকে খনা মিহিরকে সঙ্গে করে পৌঁছে দেয় তার পিতা বরাহ মিহিরের কাছে। বরাহ মিহির বালহণ্ডার দেউলানগর বা দেউলনগরের রাজা ধর্মকেতুর রাজজ্যোতিষী। পুত্র মিহিরের জন্মকোষ্ঠী ভুল গণনা করে তাকে ভাসিয়েছিলেন বিদ্যাধরীর জলে। সে মিহিরকে নিয়ে খনা হাজির হয় বরাহের সামনে, ভুল প্রমাণ করে বরাহের গণনা। ধর্মকেতুর রাজসভায় পরিচিত হন মিহির ও লীলাবতী। রাজসভাসদ পদও লাভ করেন। বরাহ মেনে নিতে পারেন না পুত্রবধূর এ উত্থান। অন্যদিকে খনা নতুন দেশের নতুন মানুষের সঙ্গে মেশে বাঁধনহারাভাবে। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় শাসককুলের সামনে। লেখ্য ভাষাহীন প্রাকৃত বর্বরদের কৃষিসংক্রান্ত জ্ঞানকাণ্ডের বিকাশে গেঁথে চলেন বচনের পর বচন, যা বেঁচে আছে আজো কৃষকের মুখে। লীলার অবাধ্যতায় ক্রুদ্ধ বরাহ পুত্রকে আদেশ করেন খনার জিহ্বা কর্তন করে তাকে উৎসর্গ করতে।
নারী প্রশ্নে, সমতার প্রশ্নে, শ্রেণীর প্রশ্নে ক্ষমতাকাঠামোর নানা সমীকরণের নিবিড় ও বহুমাত্রিক পাঠের প্রস্তাবনা নিয়ে খনা এমনই মঞ্চকৃতি, যা এই সময়ের কথাই বলে দূর অতীতের ইশারাসমেত। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শততম বর্ষপূর্তিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সহস্র সাধারণের সামনে প্রথম মঞ্চায়ন থেকে শুরু করে বিগত ৯৮টি প্রদর্শনীতে খনা দেশে-বিদেশে অসংখ্য দর্শকের অভিনন্দন ও প্রশংসায় ঋদ্ধ হয়েছে।
এ নাটকের নেপথ্যে কাজ করেছেন বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের কৃতী ব্যক্তিরা। সামিনা লুৎফা নিত্রা রচিত নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন মোহাম্মদ আলী হায়দার। মঞ্চ ও আলো আবু দাউদ আশরাফীর, সংগীত করেছেন ব্রাত্য আমিন, শারমিন ইতি ও জিয়াউল আবেদিন রাখাল, পোশাক পরিকল্পনা তাহমিনা সুলতানা মৌ ও তৌফিক হাসানের। এছাড়া প্রপস সাজিয়েছেন হুমায়রা আখতার, কোরিওগ্রাফি নাসিরুদ্দিন নাদিম ও মোহাম্মাদ রাফীর। অভিনয় করেছেন কাজী রোকসানা রুমা, ইভান রিয়াজ, ইমরান খান মুন্না, তৌফিক হাসান, মিজুনুর রহমান, শেউতি শাহগুফতা, কামরুজ্জামান সাঈদ, হাফিজা আক্তার ঝুমা, চন্দন পাল, আবদুল কাদের, লায়েকা বশীর, পংকজ মজুমদার, বাকেরুল ইসলাম, রেওয়াজ, সৃষ্টি, অন্তু মুন, পুঁথি ও অন্যরা।










