উপকূলীয় বাংলাদেশের খাবার পানিতে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা মানুষের হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় খাবার পানির বিভিন্ন উৎসে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা পাওয়ার পাশাপাশি ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদরোগের ঝুঁকি অনুমান করা হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল আইসিডিডিআর,বি’র সভাকক্ষ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে খাবার পানির লবণাক্ততা এবং স্বাস্থ্য: প্রমাণ, অভিযোজন এবং নীতিগত সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপন করা হয়।
সেমিনামের জানান হয়, গবেষণায় অংশ নেয়া ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের মধ্যে ২১ দশমিক ৬ শতাংশে আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (সিভিডি) বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ এ জনগোষ্ঠীর প্রতি পাঁচজনে প্রায় একজন এমন ঝুঁকিতে রয়েছেন। কয়রায় এ ঝুঁকির হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
আইসিডিডিআর,বি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সহযোগিতায় পরিচালিত গবেষণাটিতে উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানির লবণাক্ততা এবং এর সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক মূল্যায়ন করা হয়।
গবেষণার অংশ হিসেবে খুলনার কয়রা উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিক-আওতাধীন এলাকার ১৭২টি গ্রাম এবং তুলনামূলক এলাকা হিসেবে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন খাবার পানির উৎস মূল্যায়ন করা হয়। গবেষকরা মোট ২৭ হাজার ৬৯৭ টি পানির উৎস জরিপ করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি, অর্থাৎ ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎসকে খাবার পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
জরিপে খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যে কয়রায় ৫৫ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া যায়। অর্থাৎ কয়রায় খাবার পানির অর্ধেকেরও বেশি উৎস লবণাক্ততার প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। উপকূলীয় মানুষের জন্য নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য খাবার পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।
গবেষকদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানিতে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত আগের গবেষণাগুলোতেও পানির লবণাক্ততা ও উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিনেইস বলেন, বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা এখনো নির্ধারিত হয়নি। সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাবার পানির স্বাস্থ্যগত মান নির্ধারণে উপযুক্ত নির্দেশিকা প্রণয়নও জরুরি।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস খাবার পানির পুকুর ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানিতে দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততার কারণ হতে পারে। তাই জলোচ্ছ্বাসের পর পানির উৎস দ্রুত পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি উপকূলীয় পোল্ডার ও বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা আরো উঁচু করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
আইসিডিডিআর,বি'র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যের প্রভাব সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ এখনো সীমিত। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবসম্মত অভিযোজন কৌশল ও উদ্ভাবনের ওপর গবেষণা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণকে সমন্বিত করে কার্যকর সমাধান তৈরির ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততা একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় পরিবেশ, স্বাস্থ্য, পানি ও স্থানীয় সরকার খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য শক্তিশালী নজরদারি, উপযুক্ত মানদণ্ড এবং জলবায়ু-সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।










