দৈনিক চুক্তিভিত্তিক বাস পরিচালনার পরিবর্তে চালক ও শ্রমিকদের নির্ধারিত বেতনে নিয়োগ এবং কোম্পানিভিত্তিক পরিচালন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে রাজধানীতে সাতটি রুটে নতুন বাসসেবা শুরু হয়েছে। বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় প্রাথমিকভাবে সাতটি পরিবহন কোম্পানির অধীনে ৮৬১টি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে গতকাল দুপুর ১২টায় এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তালিকা অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় শিববাড়ী-আজিমপুর রুটে ভিআইপি সিটি পরিবহনের ২৫৩টি, টঙ্গী-আজিমপুর রুটে ঢাকা চাকা সিটি পরিবহনের ২০টি এবং মিরপুর চিড়িয়াখানা-চুনকুটিয়া রুটে চিড়িয়াখানা সিটি পরিবহনের ১৩৩টি বাস চলাচলের পরিকল্পনা রয়েছে। ঘাটারচর-ডেমরা রুটে রমজান আলী সিটি পরিবহনের ৮০টি, ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে থ্রি স্টার সিটি পরিবহনের ১২০, ঘাটারচর-ধউর রুটে পিপিবি সিটি পরিবহনের ২২৫ ও মিরপুর-১-কাকলী সার্কুলার রুটে ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের ৩০টি বাস পরিচালনার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে সাতটি রুটের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০০ কিলোমিটার। এসব রুটে এসি ও নন-এসি দুই ধরনের বাস চলবে।

তবে নতুন সেবা চালু হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে পুরনো বাস দিয়েই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব বাসের পরিবর্তে নতুন বাস যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। রুট রেশনালাইজেশন ব্যবস্থায় চলাচলকারী বাসগুলো পরিচ্ছন্ন ও সচল রাখা, ডিজিটাল বোর্ডে রুট নম্বর, গন্তব্য ও গাড়ির ক্রমিক নম্বর প্রদর্শন এবং নির্ধারিত স্টপেজের তালিকা সংরক্ষণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চালক ও কর্মীদের পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা এবং যাত্রীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে। নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা, রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘অতীতে নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রভাবশালী মহলকে প্রশ্রয় দেয়ার কারণে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ বিলম্বিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের কারণে পরিবর্তনের উদ্যোগ দ্রুততর হয়েছে। সাতটি রুটে বাস চলাচলের মধ্য দিয়ে যে কার্যক্রম শুরু হলো, তা শুধু উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঢাকার ৩২টি রুটে পর্যায়ক্রমে এ ব্যবস্থা চালু করে প্রতিটি রুটের বাসে আলাদা রঙ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, ‘এটি পরীক্ষামূলক কোনো উদ্যোগ নয়; বরং চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার সুযোগ নেই।’

অনুষ্ঠানে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দুই মাসের মধ্যে আরো চারটি রুটে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় চালকদের চুক্তিভিত্তিকের পরিবর্তে বেতনভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হবে। পাশাপাশি বাসে আলাদা রঙ, রুট নম্বর ও ডিজিটাল বোর্ড যুক্ত করা হবে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম যাত্রীদের নির্ধারিত স্টপেজ ব্যবহার এবং পরিবহন শ্রমিকদের নতুন নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সরকারের নীতিগত সহযোগিতা পেলে নতুন বাস সংগ্রহে মালিকরা ডাউন পেমেন্ট ও সমিতির গ্যারান্টি দিতে প্রস্তুত। পুরনো বাসগুলোও ধাপে ধাপে সরিয়ে নেয়া হবে।’

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এমএ বাতেনসহ পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এর আগে ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছিল ‘ঢাকা নগর পরিবহন’। ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে ১৫৫টি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলেও শুরুতে নামানো হয় মাত্র ৫০টি। একই রুটে অন্য কোম্পানির বাস চলাচল বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। অবকাঠামোগত ও পরিচালনগত সংকটের পাশাপাশি লোকসানের কারণে একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় উদ্যোগটি।

প্রসঙ্গত, বর্তমান ব্যবস্থায় চালক ও শ্রমিকরা দৈনিক চুক্তিতে বাস পরিচালনা করেন। এ ব্যবস্থায় প্রতিদিন মালিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দেয়ার পাশাপাশি নিজেদের আয়ও নিশ্চিত করতে হয় তাদের। ফলে নির্ধারিত জমার টাকা তুলতে চালকরা যাত্রী ওঠানো ও বেশি ট্রিপ দেয়ার প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েন। এতে সড়কে বেপরোয়া বাস চলাচল, যাত্রী ওঠানো-নামানোর প্রতিযোগিতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়। নতুন ব্যবস্থায় চালক ও শ্রমিকদের নির্ধারিত বেতনে নিয়োগের মাধ্যমে এ প্রবণতা কমানোর লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।