সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে সরকারি উদ্যোগে প্রথমবারের মতো দুই দিনব্যাপী সোলার এক্সপো আয়োজন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জনগণকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। গতকাল ‘সোলার এক্সপো ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ৩ ও ৪ নভেম্বর এই এক্সপো অনুষ্ঠিত হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে এর আয়োজন করছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আগে এ ধরনের এক্সপোর আয়োজন করলেও সরকারি উদ্যোগে দেশে এবারই প্রথম সৌরবিদ্যুৎ বিষয়ক এক্সপো হচ্ছে। এর মাধ্যমে জনগণের কাছে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বার্তা পৌঁছে দিতে চায় সরকার। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এরই মধ্যে অফগ্রিড ব্যবস্থায় এসেছে। সেখানে গ্রিডের বিদ্যুতের পরিবর্তে পুরোপুরি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে এ উদ্যোগ শুরু করেছেন। জনগণের সহযোগিতা পেলে এর প্রসার সম্ভব হবে।’

বিদ্যুতের চাহিদা মোকাবেলায় সৌরবিদ্যুৎ থেকে ভবিষ্যতে কী পরিমাণ সরবরাহ পাওয়া যাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে চলবে। তবে সরকারের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো, আগামী গ্রীষ্মে যেন বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষকে আগের মতো ভোগান্তিতে পড়তে না হয়। এজন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেয়া হচ্ছে।’

এক্সপোর প্রতিপাদ্য ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’। এতে সৌরপ্রযুক্তির সর্বাধুনিক উদ্ভাবন ও সরকারি উদ্যোগ তুলে ধরার পাশাপাশি বিনিয়োগে উৎসাহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম, ইডকলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম মনিরুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রদর্শনীতে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রদর্শন করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্প অর্থায়ন, সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প উন্নয়নকারী ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সেবা তুলে ধরবে। দুইদিনের আয়োজনের অংশ হিসেবে সৌর খাতের কৌশলগত উন্নয়ন, নীতিগত পরিবেশ ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে সেমিনারও অনুষ্ঠিত হবে।

সরকার সম্প্রতি সৌরবিদ্যুতের প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা দাম নির্ধারণ করেছে সাড়ে ১০ টাকা। আগামী তিন বছর এ দামে বিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা। তিন বছর পর কী হবে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিনারা মাহরুখ বলেন, ‘ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার খরচ বিবেচনায় নিয়ে এ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাটারি ছাড়া ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ইউনিটপ্রতি ৩-৪ টাকা। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ১, ২, ৬ বা ৮ ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখা যায়। ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যবস্থাসহ উৎপাদন খরচ ইউনিটপ্রতি প্রায় ৮ টাকা। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, তিন বছরের জন্য এ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিটের দাম ১০ টাকা ৯ পয়সা। তিন বছর পর তা পুনর্নির্ধারণ করা হবে। তবে দাম সাড়ে ১০ টাকার নিচে নামার সম্ভাবনা নেই। বরং সরকারের হিসাবে এ কর্মসূচি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেললে ভর্তুকির পরিমাণ কমবে। সেক্ষেত্রে তিন বছর পর বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে, কমার সম্ভাবনা নেই।

সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন ও বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে সরকার এরই মধ্যে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের লক্ষ্যে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-৩০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি নেট মিটারিং ব্যবস্থায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের উদ্বৃত্ত প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকায় কেনার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।

বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে নিজস্ব মূলধন ছাড়াই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সৌর প্যানেল স্থাপনে ওপেক্স মডেল উৎসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি-সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি শুল্ক ১ শতাংশে নামানো হয়েছে এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) পুরোপুরি মওকুফ করা হয়েছে।