সরকার আমদানি নির্ভর জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট ধীরস্থিরভাবে উন্নতি করবে। সরকার আমাদানি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে বিকল্প জ্বালানিতে যেতে চাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আছে। একইসঙ্গে নিউক্লিয়ার ও কয়লাতেও আমরা জোর দিচ্ছি।
শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শিরোনামে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশে মজুদকৃত কয়লা উৎপাদনের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই সেদিকে যেতে হবে। সেখানেও ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমান সরকার দেশে একটি ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে; কারণ স্থানীয় বিনিয়োগ সম্প্রসারিত না হলে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা যত গভীরেই থাকুক না কেন, সেগুলো নিরসন করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ব্যবসায়ী সমাজের সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার একটি ওয়েবসাইট তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকার পৃষ্টপোষকতার অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে গণতান্ত্রিক অর্থনীতির দিক ধাবিত হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো না গেলে সরকারের কোনো উদ্যোগই সফল হবে না। এক্ষেত্রে অটোমেশনের কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া প্রচলিত উৎসের বাইরে বিকল্প অর্থায়নের জন্য দেশের পুঁজিবাজারকে শক্তিশালীকরণে ইতোমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শীঘ্রই এর সুফল দেশবাসী পাবেন, সেই সাথে বেশকিছু বন্ড প্রবর্তনের বিষয়ও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, বাণিজ্য বাধা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, সরবরাহ চেইন প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনের খরচ দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণে সামগ্রিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘসময়ের জন্য বজায় থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে নিম্নমুখী ঋণ প্রবাহ অর্থনীতির জন্য খুবই উদ্বেগজনক। এ প্রেক্ষিতে রফতানিতে লিডটাইম কমাতে শিল্পাঞ্চলসমূহে সব ধরনের সেবার নিরবিচ্ছিন্ন প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা একটি যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছি। এখানে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কাঙ্খিত গতি পরিলক্ষিত হবে না, বরং পিছিয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হবে। অর্থনীতির নানাক্ষেত্রে হয়রানি একটা নেতিবাচক কাঠমোতে পরিণত হয়েছে, ফলে সংষ্কার কার্যক্রম কাজে আসছে না। সরকার এদিকে নজর না দিলে করজাল সম্প্রসারিত হবে না। এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক স্বদিচ্ছাও জরুরি।
অনুষ্ঠানে আরেক বিশেষ অতিথি ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চিত্রে মূল্যস্ফীতি এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেমে আসেনি। বেসরকারিখাতে ঋণপ্রবাহও দীর্ঘদিনের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতার পাশাপাশি শিল্পখাতও পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারছে না। একইসঙ্গে উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তোরণের জন্য যে সময়সীমা রয়েছে, তার মধ্যেই যথাযথ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন সেমিনারের আরেক বিশেষ অতিথি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার। তিনি বলেন, আমাদের নীতিমালা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে বেশ ফারাক রয়েছে। ফলে যেকোনো সিদ্ধান্তের কাঙ্খিত সুফল পাই না আমরা। রফতানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে আমরা যতটা উদার, পণ্য আমদানিতে ততটাই কঠিন নীতিমালা। এরফলে আমদানিতে উচ্চ শুল্কহার বজায় থাকছে এবং স্থানীয়ভাবে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের মূল্যও বাড়ছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণে বিল্পব ঘটাতে হবে বলে মনে করেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে ৩ লাখ কোটি টাকা এডিপির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, অথচ গত বছর বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্রা ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ৪৫ শতাংশ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করতে হবে, যা খুবই অসম্ভব। যদিও বাজেটে ভালো কিছু উদ্যোগ রয়েছে, কিন্তু মুদ্রানীতিতে সেটির প্রতিফলন নেই। এরফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মুদ্রানীতির সংস্কার জরুরী।
অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, রেমিট্যান্স নির্ভর অর্থনীতিতে দীর্ঘসময়ের জন্য মূল্যস্ফীতির চাপ সবসময় বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করাও বেশ কঠিন। তাই ব্যাংকের তারল্য বাড়ানোর উপর নজর দিতে হবে। এছাড়াও সার্বিকভাবে বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুইভাগ করাই একমাত্র সমাধান নয়; এর সঙ্গে দুর্নীতি কমানো ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকার বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে নানা রকম সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করছে; কিন্তু স্থানীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে না। এজন্য নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষার পাশাপাশি লজিস্টিকস খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। জ্বালানি প্রাপ্তিসহ সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে সুদ হার কমালেও স্থানীয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।
ট্রান্সকম লিমিটেড গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান বলেন, বাজেটে ব্যবসা সহায়ক নীতি থাকলেও বেসরকারিখাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। এজন্য উচ্চ সুদ হার ও মূল্যস্ফীতি, খেলাপী ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাত হতে সরকারের অধিকহারে ঋণ গ্রহণই প্রধানত দায়ী। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তারা। এছাড়াও শিল্পখাতের কাঁচামালের মূল্য বেশি থাকায় পণ্য উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মাঝে বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন সভাপতি হোসনে খালেদ, আবুল কাসেম খান, বেনজীর আহমেদ, রিজওয়ান রাহমান প্রমুখ।










