মুম্বাইয়ের ধারাবি বস্তিতে কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয় গত এপ্রিলে। তখন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছিলেন, দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়বে। হয়ে উঠবে ভারতে করোনাভাইরাসের শীর্ষ ভরকেন্দ্র। জুনের মাঝামাঝিতে এসে মুম্বাইসহ পুরো মহারাষ্ট্র যখন বিপর্যস্ত, তখন করোনা প্রতিরোধে ধারাবির সাফল্য প্রশংসিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকলেও পরীক্ষায় এখনো অবহেলিত ঢাকার বস্তিগুলো। এসব বস্তিতে নেই কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা, তাই নেই সংক্রমণের তথ্যও।
২০১৪ সালে দেশে বস্তি শুমারি করা হয়েছিল। তখন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে বস্তির সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৯৪। সোয়া দুই লাখ খুপরি ঘরে সরকারি হিসাবে বাসিন্দা ছিল সাড়ে ছয় লাখ। পরের ছয় বছরে বস্তির সংখ্যার সঙ্গে বেড়েছে বাসিন্দা। মুম্বাইয়ের ধারাবি বস্তিতে যখন করোনা সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তখন উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত বস্তির বাইরে থাকা স্কুল, কমিউনিটি সেন্টারের মতো স্থাপনাগুলোয় আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঢাকার বস্তিগুলো নিয়ে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথা জানাতে পারেননি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা। যদিও দেশে যত কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে, তার ৪৮ শতাংশই ঢাকা মহানগরের।
দুই মাসের বেশি সময় সাধারণ ছুটি দিয়েও যখন কমেনি ভাইরাসের সংক্রমণ, তখন ঢাকার ৪৫ এলাকায় জারি করা হয়েছে কঠোর লকডাউন। নমুনা সংগ্রহের নির্দিষ্ট বুথ, সার্বক্ষণিক পুলিশি টহল, স্বেচ্ছাসেবী নিয়োজিত করাসহ লকডাউন করা এলাকায় নানা পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বিপরীতে বস্তিবাসীর জন্য করোনা পরীক্ষা তো দূরের কথা, নমুনা দেয়ারও ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সামান্য ত্রাণসহায়তা বাদে আর কিছুই হয়নি। সেই ত্রাণও বস্তিবাসী যতটা পেয়েছে, অভিযোগ রয়েছে তার চেয়ে বেশি পেয়েছে বস্তিসংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীরা।
পশ্চিমে বনানী। উত্তর-পশ্চিমে গুলশান। দুই অভিজাত এলাকার ঠিক মধ্যখানে কড়াইল বস্তি। আয়তন-জনসংখ্যায় ঢাকার সবচেয়ে বড় বস্তি কড়াইল। কমবেশি বিশ হাজার খুপরি ঘরে লাখ তিনেক মানুষের বাস। একেকটি খুপরি ঘরে থাকে পাঁচ-সাতজন। পাঁচ-সাতটি খুপরির জন্য একটি টয়লেট। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সংক্রামক রোগের সব উপকরণই বিদ্যমান। জ্বর-সর্দির রোগী থাকলেও কড়াইল বস্তিতে করোনা রোগীর সংখ্যা কত কিংবা আদৌ রোগী আছে কিনা, সে সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই। রাখা হয়নি পরীক্ষার ব্যবস্থাও। করোনা আতঙ্ক থাকলেও বস্তিবাসী বেশি চিন্তিত জীবিকা নিয়ে। দুবেলা ভাতই যেখানে জোটে না, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা তাদের জন্য বিলাসিতা মাত্র।
‘স্লামডগ মিলিয়নেয়ার’ খ্যাত মুম্বাইয়ের ধারাবি বস্তির সঙ্গে ঢাকার কড়াইল বস্তির খুব একটা পার্থক্য নেই। গতকাল সরেজমিন ঘুরে কড়াইলে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কোনো সরকারি উদ্যোগই চোখে পড়েনি। দুয়েকটি হাত ধোয়ার ড্রাম বসিয়েই দায় সেরেছে সিটি করপোরেশন। বাসিন্দার সিংহভাগই মাস্ক ছাড়া চলাফেরা করছে। স্থানের সংকুলান না হওয়ায় চলাফেরা করছে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। পুরো বস্তি ঘুরে কোথাও জীবাণুনাশক টানেল যেমন চোখে পড়েনি, তেমনি দেখা মেলেনি করোনার নমুনা সংগ্রহের কোনো বুথও।
এত অবহেলিত থাকার পরও করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি বলে দাবি বস্তিবাসীর। কড়াইল বস্তিতে ১৮ বছর ধরে থাকছেন মর্জিনা বেগম। তিনি জানান, দুয়েকজনের জ্বর সর্দি হওয়ার খবর তিনি শুনেছেন। কিন্তু কারো করোনা হয়েছে, এমন কিছু তিনি গতকাল পর্যন্ত জানতে পারেননি। তার দাবি, নোংরা পরিবেশে থাকলেও কড়াইল বস্তি এখনো করোনামুক্ত। মর্জিনা বেগম গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে। মার্চের মাঝামাঝিতে তাকে কাজে নিষেধ করে দেয়া হয়। এর পর থেকেই বেকার জীবন কাটছে। করোনাভাইরাসের চেয়ে জীবিকার ভয়টাই বেশি পাচ্ছেন বলে বণিক বার্তাকে জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করছেন, করোনাভাইরাস বস্তিবাসীর মধ্যে যতটা ছড়াবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে সে তুলনায় সংক্রমণ কম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা মনে করেছিলাম বাংলাদেশে করোনার প্রথম বড় ধাক্কাটা আসবে বস্তিগুলো থেকে। কিন্তু সংক্রমণের ১০০ দিনের বেশি অতিক্রম হলেও বস্তিগুলো এখনো সুরক্ষিত আছে। এমন না যে বস্তিগুলোতে ভাইরাস প্রবেশ করেনি। প্রবেশ করলেও সেটার বিস্তার সেভাবে হয়নি। হলে এতদিনে তা ঠিকই প্রকাশ পেত।
এমন হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, বস্তিবাসীর জীবনাচরণের কথা। তার মতে, বস্তির মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে, আলো-বাতাসে থাকে, এসব কারণে হয়তো তাদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ কম হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
করোনা না হলেও খাবারে ঠিকই টান পড়েছে বস্তিবাসীর। কড়াইল বস্তিতেই আট ফুট বাই আট ফুট একটি ঘরে থাকেন সবুজ ব্যাপারী। একটি হোটেলে বাবুর্চির কাজ করতেন। তিন মাস ধরে হোটেল বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার নেই। সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তিনি বলেন, এতদিন হয়ে গেল, কেউ এক পয়সা সাহায্য করল না। এভাবে আর কিছুদিন চললে হয়তো না খেয়েই মরতে হবে।
কড়াইল বস্তির মতোই অবস্থা ঢাকার অন্য সব বস্তির। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা বস্তিবাসী করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকলেও তা মোকাবেলায় বলতে গেলে কোনো ব্যবস্থাই রাখেনি সরকার। এমনকি কোন বস্তিতে কতজন কভিড-১৯ রোগী আছে, সে তথ্যও নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা মন্ত্রণালয়ের কাছে।
করোনা মোকাবেলায় জাতীয় পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভাইরোলজিস্ট নজরুল ইসলাম মনে করেন, ঢাকাসহ দেশের বস্তিগুলোতে করোনা প্রতিরোধে যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার ছিল, তা বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। শুধু বস্তি এলাকা নয়, করোনার বিস্তার ঠেকাতে আমরা কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারিনি। তার পরও বস্তি এলাকাগুলোয় ভাইরাসের সংক্রমণ বলতে গেলে নেই। সর্বোচ্চ ঝুঁকি থাকার পরও বস্তিগুলোতে করোনা সংক্রমণ কেন কম হচ্ছে, সেটি গবেষণার একটি ভালো বিষয় হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।









