ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে ভঙ্গুর বাংলাদেশ এখন পুনর্গঠনের সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নির্ধারণ বিষয়ক জাতীয় সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শোষণ-শাসন বাংলাদেশকে একটি ঋণ নির্ভর ও আমদানি নির্ভর ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশসহ সকল ক্ষেত্রে ভঙ্গুর এ রাষ্ট্র এবার পুনর্গঠনের পালা। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রা পথে এসডিজি’র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য।

তিনি আরো বলেন, এরই অংশ হিসেবে জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে। এই অবকাঠামো দেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি’র সঙ্গে সমন্বিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিএনপির জননীতি’র দিকে লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সব সময় বিএনপির সকল পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি জনবান্ধব। তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের উন্নয়নে- সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯-দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা। ঐতিহাসিকভাবে প্রতিটিই মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) কিংবা বর্তমানের সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলের (এসডিজি) ভিশন ও মিশনের সঙ্গে খুব বেশি অমিল নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিল, এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ যথাযথভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলছে। আপনারা লক্ষ্য করবেন, এসডিজি’র প্রতিপাদ্য ‘নো ওয়ান লিভ বিহাইন্ড’ কিংবা ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ মূলনীতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের জননীতিরও মিল রয়েছে। তিনি বলেন, সব শ্রেণী-পেশা তথা জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের গৃহীত ‘সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ স্তম্ভ'র মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জেন্ডার সমতা এবং জলবায়ু সহনশীলতা এবং সুশাসন এসডিজি’র এই মূল অগ্রাধিকারগুলোই প্রতিফলিত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি সুসংহত করতে বর্তমান সরকার ‘পুনরুদ্ধার-পুনর্বাসন-পুনর্গঠন বা রিকোভারি-রিহ্যাবিলিটেশন-রিকন্সট্রাকশন এই থ্রি-আর কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে সাময়িক স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তর- সবকিছুই একটি সুসংহত নকশায় বাস্তবায়িত হবে।

তারেক রহমান বলেন, জনগণের রায়ে বর্তমান সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরদিন থেকেই নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষক কার্ড, জনস্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সেবা সহজ করতে ই-হেলথ কার্ডের মতো একাধিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়ন করে চলছে। তিনি আরো বলেন, এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণজনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, আর্থিক সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্পোর্টস কার্ড, সারা দেশে ইমাম মুয়াজ্জিন এবং বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয়গুরুদেরকেও সম্মানী ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো না কোনো উপায়ে দেশের প্রতিটি শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে সরকারের সহায়তা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেন, এভাবে চলতি মেয়াদের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা বলয় এবং আর্থিক সহায়তা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সুচিন্তিত পথনকশা সরকারের রয়েছে।

‘এসডিজি ভিলেজ’ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এবার রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর এই তিনটি গ্রামকে এসডিজি স্থানীয়করণের একটি পাইলট মডেল হিসেবে প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এই গ্রামগুলোতে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণ, স্কুল ড্রেস, মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রাম পর্যটন, ওয়ান ভিলেজ-ওয়ান প্রোডাক্ট, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন ও ইকোট্যুরিজমসহ বিভিন্ন কর্মসূচি একযোগে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। একইসঙ্গে এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে।

তিনি বলেন, এই উদ্যোগের সাফল্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সারাদেশের অন্যান্য গ্রামেও এই মডেল সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আশা করি, এসডিজি ভিলেজ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারকে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ডেভেলপমেন্ট মডেল’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার একটি দৃষ্টান্তমূলক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে।

কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা।

তিনি বলেন, আশা করি, তিনদিনের এই সম্মেলনে প্রতিটি সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের অভীষ্টভিত্তিক অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেবেন।

তারেক রহমান বলেন, আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায় কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। এর একটি হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা। আরেকটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার হবে সর্বজনীন। এবং একটি কল্যাণ রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত থাকবে।

তিনি বলেন, ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে আসুন আমরা সবাই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস. এম. শাকিল আখতার এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।