ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন ব্যবস্থাসহ দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি উঠেছে সুশীল সমাজ ও জনগণের পক্ষ থেকে। তবে নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। এর মধ্যে দ্রব্যমূল্য হ্রাস থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিভিন্ন দাবি উঠে এসেছে। সম্প্রতি পরিচালিত এক সমীক্ষায় এ চিত্র দেখা গেছে। ‘‌পালস সার্ভে ২০২৪: জনগণের মতামত, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা’ শিরোনামে  সমীক্ষা পরিচালনা করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)। জরিপে রাজনীতি ও আর্থসামাজিক বিভিন্ন দিকে বাংলাদেশী নাগরিকদের উপলব্ধি নিয়েও আলোকপাত করা হয়েছে।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘‌অভ্যুত্থানের চল্লিশ দিন: মানুষ কী ভাবছে?’ শীর্ষক এক উন্মুক্ত আলোচনা সভায় এ সমীক্ষার ফল তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে বিআইজিডি।

গত ২২ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলা থেকে মোট ২ হাজার ৩৬৩ নারী-পুরুষের কাছ থেকে এ জরিপের জন্য টেলিফোনে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে, আর শহরে বাস করে বাকি ৩৩ শতাংশ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, সংস্কার, অপরাধ-সহিংসতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রচেষ্টা জনগণের কাছে জানতে চাওয়া হয়।

সমীক্ষায় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে প্রথম দাবি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ৩২ শতাংশ মানুষ অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলেছে। এর মধ্যে রয়েছে মূল্য হ্রাস, বাজার নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্কার। ১৭ শতাংশ মানুষ রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংস্কারের দাবি করেছে। ১২ শতাংশ মানুষ আইনের সংস্কার, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচার বিভাগ মুক্তকরণ, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সংস্কার এবং সংবিধান সংশোধনসহ আইনের শাসনের দাবি করেছে। প্রায় ৮ শতাংশ দাবি করেছে স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এবং ৭ শতাংশ দুর্নীতি হ্রাস করার কথা বলেছে।

উন্মুক্ত আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জরিপের ফলাফল দেখাচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যাত্রা সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই ইতিবাচক। আমরা পূর্ববর্তী ইতিহাসে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এ ধরনের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখেছি। অন্যদিকে আমরা কিন্তু হতাশাও দেখেছি। নাগরিকেরা সংস্কার চায়, কিন্তু প্রকৃত সংস্কার তখনই সম্ভব, যখন আমরা আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করব।’

বক্তব্য রাখেন বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা ও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ শাহান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্লাটফর্মের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, মামুন আব্দুল্লাহি প্রমুখ।

এছাড়া জনগণের কাছ থেকে শিক্ষা ও নৃশংসতার বিচারও সংস্কারের দাবি হিসেবে উঠে এসেছে। আর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টাকে ১০০-এর মধ্যে গড়ে ৭৫ রেটিং দিয়েছেন সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা।

বিভিন্ন উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা সত্ত্বেও উত্তরদাতাদের ৫৩ শতাংশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে, যেখানে মাত্র ১৩ শতাংশ হতাশা প্রকাশ করে।

সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের কাছে জুলাই-আগস্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ৭১ শতাংশই বাংলাদেশ সঠিক পথে রয়েছে বলে মত দেয়। আর বাংলাদেশ ভুল পথে রয়েছে বলে বিশ্বাস করে ১২ শতাংশ। একইভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের গতিপথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে ৬০ শতাংশ মানুষ দেশ সঠিক পথে যাচ্ছে ও ২৭ শতাংশ মানুষ দেশ ভুল পথে যাচ্ছে বলে মতামত দেয়।