অন্য আট-দশটা শিশুর মতো ছিল না ছোট্ট তাসনীম সুমাইয়া। তার মধ্যে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব ছিল, যা সবার মন কেড়ে নিত। কোলাহলপূর্ণ খেলার বয়সেও তার পছন্দ ছিল সুর করে গজল শোনা। কোনো কিছুর জন্য কখনো সে বায়না বা আবদার করত না। ধর্মের প্রতি ছোট্ট মেয়েটির এ শান্ত অনুরাগ দেখেই বাবা মো. সালাহউদ্দিন মনে মনে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ এঁকেছিলেন। বড় বোনদের সাধারণ স্কুলে পড়ালেও তাসনীমকে নিয়ে তার পরিকল্পনা ছিল অন্য রকম। তাকে ভর্তি করাবেন একটি ভালো মাদরাসায়। সেই অনুযায়ী আগামী জানুয়ারিতে ভালো একটি মাদরাসায় ভর্তি করানোর বিষয়টিও একপ্রকার চূড়ান্ত করে রেখেছিলেন বাবা। কিন্তু কে জানত, একটি মশার কামড়ই সবকিছু চিরতরে ওলটপালট করে দেবে! মাত্র কয়েক দিনের জ্বর যেন চোখের পলকে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন ও আশা লণ্ডভণ্ড করে দিল।
চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ কাট্টলীর আব্দুর পাড়ার বাসিন্দা গার্মেন্টস কর্মী মো. সালাহউদ্দিন বলছিলেন তার চার বছর বয়সী ছোট মেয়ে তাসনীম সুমাইয়ার কথা। গত ১১ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুর কাছে হেরে না ফেরার দেশে চলে গেছে শিশুটি। এক মাস পেরিয়ে গেলেও নিষ্পাপ তাসনীমের স্মৃতি যেন কিছুতেই চোখ থেকে সরতে চায় না সালাহউদ্দিনের। কথা বলতে বলতেই চোখের কোণে পানি জমে ওঠে।
স্মৃতিচারণ করে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমার তিন মেয়ের মধ্যে তাসনীম ছিল সবার ছোট। বড় মেয়ে কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে, সেজো মেয়ে পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। ছোট মেয়েটাকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এক ডেঙ্গু এসে আমার সব কেড়ে নিল। আদুরে মেয়েটা যে আমার ঘরে নেই, সেটা এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার মেয়ের সারাদিন এ ঘর থেকে ও ঘরে ছুটে বেড়ানো কীভাবে ভুলব আমি! কার কাছে বিচার চাইব, সেটাও জানি না। আমার ছোট্ট মেয়েটার তো দোষ ছিল না।’
তাসনীমের বিদায়ের গল্পটি কেবল মৃত্যুর নয়, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে চলা এক বাবার হাহাকারেরও। গত ৭ সেপ্টেম্বর হঠাৎ জ্বর আসে তাসনীমের। পরদিন স্থানীয় এক পল্লীচিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করালে ধরা পড়ে ডেঙ্গু। ওষুধ আর স্যালাইন চলায় কিছুটা স্বাভাবিক মনে হলেও হঠাৎ শুরু হয় বমি, দ্রুত নামতে থাকে রক্তচাপ।
পরিস্থিতি জটিল দেখে ৯ সেপ্টেম্বর স্বজনরা তাকে নিয়ে যান নগরীর মা ও শিশু হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে কোনো শয্যা খালি ছিল না। পরদিন প্রথমে ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতালে এবং সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় তাকে। ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। টানা তিন হাসপাতালের দরজায় দৌড়ঝাঁপ শেষে ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর নির্মম আঁধারে ঢলে পড়ে অবুঝ তাসনীম।










