পুরোনো জাহাজ ভেঙে লোহা ও অন্যান্য ধাতু পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে জাহাজভাঙা শিল্প। একই সঙ্গে এ খাতে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান। তবে শিল্পটির অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিপরীতে শ্রমিকের মৃত্যু, আহত হওয়া, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগও রয়েছে। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও বিচার না পাওয়ায় শিল্পটির নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে জানিয়েছেন ‘সকল প্রাণের নিরাপত্তা’ (সপ্রান) ও অল ভিক্টিমস অ্যান্ড ভেটারান্স নেটওয়ার্কের (এভিএন) প্রতিনিধিরা।

আজ সোমবার ঢাকার বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সপ্রান ও এভিএনের যৌথ উদ্যোগে ‘জাহাজ ভাঙার মানবিক মূল্য: বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে জবাবদিহি, প্রতিকার ও পুনরাবৃত্তি রোধ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। ২০২৪ সালে এস এন করপোরেশনের ইয়ার্ডে এমটি সুবর্ণ স্বরাজ্য জাহাজে বিস্ফোরণের দুই বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে এ আলোচনার আয়োজন করা হয়।

২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ২ হাজার ৪৯৮টি জাহাজ ভাঙা হয়েছে। এ সময়ে জাহাজভাঙা-সংক্রান্ত ১৩০টি দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে এস এন করপোরেশনের ইয়ার্ডে এমটি সুবর্ণ স্বরাজ্য জাহাজে বিস্ফোরণের ঘটনায় শ্রমিক হতাহত হন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, জাহাজভাঙার দুর্ঘটনায় শ্রমিক মারা গেলেও অনেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা হয় না। নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি, দুর্বল তদারকি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় একই ধরনের দুর্ঘটনা পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি রয়েছে। শ্রমিকদের ঝুঁকির তুলনায় মজুরিও কম বলে অভিযোগ করেন তারা।

সপ্রানের গবেষক অপসরা ইসলাম তন্দ্রা বলেন, এককালীন ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও মানসিক পুনর্বাসন, ঘটনার সত্যতা উদঘাটন এবং পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা।

আলোচনায় নিহত চার শ্রমিকের পরিবারের সদস্যরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। নিহত হাবিবের স্ত্রী সাবিনা খাতুন প্রশ্ন করেন, একজন মানুষ মারা গেলে তার জীবনের মূল্য কী মাত্র ৭ লাখ টাকা? নিহত বরকতের শাশুড়ি রোকেয়া বেগম সন্তানদের জন্য নিয়মিত মাসিক সহায়তার দাবি জানান। নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শারমিন বেগম সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসায় সহায়তা এবং নিহত খায়রুলের বাবা কামাল শেখ ছেলের মৃত্যুর বিচার ও জবাবদিহি দাবি করেন।

বেলার নীতি ও প্রচার সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরী বলেন, শুধু পরিবেশবান্ধব জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের সনদ থাকলেই শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। জাহাজভাঙার কাজে শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পুরোনো জাহাজে থাকা অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে এ ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, আইন ও প্রতিষ্ঠান থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ ও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিশন গঠন করা হলেও তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ না করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ব্লাস্টের সহকারী পরিচালক মো. তৈয়্যেবুর রহমান বলেন, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকের আয়, বয়স, পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা এবং ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নেয়া উচিত।

আলোচনায় শ্রম আইন সংশোধনের পাশাপাশি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। শ্রম আইনে ১৫০ কার্যদিবসের বিধান থাকলেও বাস্তবে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা। একই সঙ্গে হংকং কনভেনশনের মানদণ্ড অনুসরণ, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং সৈকতে নয়, নির্ধারিত নিরাপদ ব্যবস্থায় জাহাজভাঙার দাবি ওঠে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতরের সায়মা করিম শ্যানন বলেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, শ্রমিক-মালিকের ক্ষমতার অসমতা, মামলা করতে অনীহা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের আইনের শাসনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রোমানা শোয়াইগার বলেন, দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে শুধু ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট নয়। তাদের জন্য সহজপ্রাপ্য ও কার্যকর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, দায় নির্ধারণ ও পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়া যেন দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা বা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে থেমে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের অভিযোগ শোনা, প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া এবং ন্যায়বিচারের পথ সহজ করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব।

রোমানা শোয়াইগার আরো বলেন, এসব ঘটনা পর্যালোচনা করে কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে। দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ভুক্তভোগীদের প্রতিকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কিনা, কমিশন তা নজরদারি করতে পারে।