এর আগে শুক্রবার ভোরে একই উপজেলার কাইল্যানীতে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি উপচে পড়া শুরু হয়। এতে বিভিন্ন জায়গায় বাঁধে ভাঙন দেখা যায়। কৃষকরা চেষ্টা চালিয়ে যান বাঁধ রক্ষার। এর পরও শালদিঘা হাওরের অন্তত ৩০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। যদিও পরে ওই হাওরে পানি প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হয়।

কৃষকরা বলছেন, হাওরে এখন কৃষকরা ডুবে যাওয়া ধান কাটা ও বাঁধ রক্ষা নিয়ে উভয়সংকটে পড়েছেন। ডুবে যাওয়া ধান কাটতে গেলে বাঁধ ভেঙে পানি বাড়ছে আর বাঁধ রক্ষা করতে গেলে তাদের ধান নষ্ট হচ্ছে।

মধ্যনগর উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে গতকাল সোমেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। এতে সকালেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন বাঁধের ওপর দিয়ে প্রথমে বোয়ালা হাওরে পানি প্রবেশ করতে থাকে। পরে এর গতিবেগ তীব্র হওয়ায় বাঁধটি ভেঙে যায়। স্থানীয় কৃষক ও প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা ভাঙনের তীব্রতা ঠেকাতে কাজ করলেও সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাঁধের কাজে অবহেলা ছিল। ফলে সেটি পানির স্রোতের কারণে ভেঙে গেছে।

মধ্যনগর গ্রামের কৃষক মুরাদ মিয়া বলেন, ‘আমার ১৭ কেয়ার জমি কাটা বাকি ছিল। শনিবার সকালে ধান কাটা শ্রমিক নিয়ে হাওরে গিয়েছিলাম, এ সময় বাঁধ ভেঙে চোখের সামনেই সব ফসল তলিয়ে যায়।’

বোয়ালা হাওরে এবার ৫৭৪ হেক্টর বোরো ধান চাষ করা হয়। ৫০০ হেক্টরের বেশি জমির ধান কৃষকরা ঘরে তুললেও বাঁধ ভেঙে ৩০ হেক্টরের মতো তলিয়ে যায়।

মধ্যনগর ইউনিয়ন কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন অবশ্য বলেছেন, বোয়ালা হাওরে ২০ হেক্টরের মতো জমির ধান কাটা হয়নি। এগুলো ডুবে গেছে।

এর আগে শুক্রবার বাঁধ ভেঙে মধ্যনগর উপজেলার শালদিঘা হাওরে পানি ঢুকছিল। দিনভর চেষ্টার পর ভাঙনের অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ আটকানো সম্ভব হয়। তার আগেই অনেক জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। শালদিঘা হাওরের কৃষক নিরঞ্জন সরকার বলেন, ‘হাওরের অর্ধেকের বেশি জমির ধান এখনো কাটা হয়নি। আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি।’

একই এলাকার কৃষক রনি তালুকদার বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে ধান কাটতে পারছি না, কাটলেও শুকাতে পারছি না। এর মধ্যে আবার বাঁধ রক্ষার কাজ করতে হচ্ছে। আমরা এখন চরম বিপদে আছি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিস উইং জানিয়েছে, ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে সৃষ্ট বন্যায় হাওরের ২৮ হাজার হেক্টর বোরো ধান পানিতে তলিয়েছে। যদিও উইংটির পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল জানিয়েছেন, ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব এখনো শেষ হয়নি। কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং এর প্রভাব কতটা সেটি নিরূপণের কাজ চলমান।

হাওরবেষ্টিত আরেক জেলা নেত্রকোনায় টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বাজারমূল্যে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৭০ কোটি টাকার বেশি।

সরজমিনে দেখা গেছে, জেলায় টানা বৃষ্টিপাতের ফলে হাওরে কৃষকরা এখন কোমরপানিতে নেমে তাদের একমাত্র বোরো ফসল কেটে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। নেত্রকোনার আটপাড়ার সুমাইখালী এবং মদনের গণেশের হাওরসহ খালিয়াজুরী ও মোহনগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওরের এখন নিত্যচিত্র। এসব এলাকার কৃষকরা ঝুঁকি নিয়েই ধান কাটার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন, কেউবা কাটা ধান নৌকায় তুলে উঁচু জায়গায় নিচ্ছেন। বসে নেই নারীরাও, ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে তারাও প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছেন কষ্টার্জিত ফসল রক্ষায়।

জেলাটিতে শ্রমিক সংকটও দেখা দিয়েছে, ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অধিক টাকা খরচ করে যে ধান কাটা হয়েছে, সেগুলোও ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না রোদ কিংবা খলা ডুবে যাওয়ায়। ফলে একদিকে ধানের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ন্যায্য বাজার মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক।

পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকাল সকাল ৯টার বুলেটিনে জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকার সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের পাঁচ নদীর ছয়টি স্টেশন প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের নলজুর নদীর পানি ১১ সেন্টিমিটার ওপরে, নেত্রকোনার ভুগাই-কংস নদীর পানি ১০৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, কলমান্দায় সোমেশ্বরী নদী ৭৪ সেন্টিমিটার ওপরে, নেত্রকোনা পয়েন্টে মগরা নদী ৮২ সেন্টিমিটার ওপরে, আটপাড়া পয়েন্টে মগরা নদীর পানি ২৮ সেন্টিমিটার এবং হবিগঞ্জের সুতাং নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে আগামী তিনদিন মাঝারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওরসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার ধনু-বাউলাই নদীর পানিও বাড়তে পারে আগামী তিনদিন। এতে করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বাউলাই নদীর অববাহিকার হাওরসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে।