দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী স্বাভাবিক সময়ের আগেই মেনোপজের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ, কম শিক্ষিত এবং অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান জন্ম দেয়া নারীদের মধ্যে এ ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে। আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি ১৩ জন নারীর মধ্যে একজনের ৪৫ বছর বয়সের আগেই মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী বিএমজি প্লোবাল হেলথে প্রকাশিত গবেষণায় ৪৪টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের নারীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, এসব দেশে গড়ে প্রতি ১৪ জনে একজন নারীর ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজ হয়। বাংলাদেশে এ হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা গবেষণাভুক্ত দেশগুলোর গড় হার ৭ দশমিক ১ শতাংশের চেয়ে বেশি।
সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে নারীদের স্বাভাবিকভাবে মেনোপজ হয়। তবে ৪৫ বছরের আগে হলে তাকে ‘আর্লি মেনোপজ’ এবং ৪০ বছরের আগে হলে ‘প্রিম্যাচিউর মেনোপজ’ বলা হয়। সময়ের আগে মেনোপজ হলে ইস্ট্রোজেন হরমোনের সুরক্ষামূলক প্রভাব দ্রুত কমে যাওয়ায় হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস (হাড় ক্ষয়), স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও বিষণ্নতার মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়।
গবেষণায় ৪৪টি দেশের ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৮ নারীর জাতীয় ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (ডিএইচএস) তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেসব নারী অন্তত ছয় মাস ধরে মাসিক হয়নি অথবা মেনোপজ কিংবা জরায়ু অপসারণের তথ্য দিয়েছেন, তাদের তথ্যের ভিত্তিতে ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজ হওয়া নারীদের শনাক্ত করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১২ মাসের সংজ্ঞা ব্যবহার করে পুনর্বিশ্লেষণেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানও উদ্বেগজনক। নেপালে সময়ের আগে মেনোপজের হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, ভারতে ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। গবেষকদের মতে, এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
গবেষণায় শহর-গ্রামের বৈষম্যও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, কর্মসংস্থান ও প্রজনন ইতিহাসের মতো বিষয় বিবেচনায় নেয়ার পরও গ্রামীণ নারীদের মধ্যে ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজ হওয়ার ঝুঁকি শহরের নারীদের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। গবেষকদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও জীবনযাত্রার মানে দীর্ঘদিনের বৈষম্য এর অন্যতম কারণ।
শিক্ষাকে সময়ের আগে মেনোপজের ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষামূলক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেসব নারীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, তাদের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়া নারীদের ঝুঁকি ১১ শতাংশ কম, মাধ্যমিক শিক্ষিতদের ২৮ শতাংশ কম এবং উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি ৫৮ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।
একই সঙ্গে দেখা গেছে, যেসব নারী ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন এবং প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তাদের সময়ের আগে মেনোপজ হওয়ার ঝুঁকি অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
দেশভেদেও সময়ের আগে মেনোপজের হারে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। ইথিওপিয়ায় এ হার সবচেয়ে বেশি ১২ শতাংশ। এরপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (১১ দশমিক ৫ শতাংশ) ও মিয়ানমার (১০ দশমিক ৩ শতাংশ)। অন্যদিকে জর্ডানে সবচেয়ে কম ২ দশমিক ৩ শতাংশ, গ্যাবনে ২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আর্মেনিয়ায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ।
গবেষণার প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআর,বির গবেষক রাইসা বিনতে ইসলাম বলেন, আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, আর্লি মেনোপজ শুধু জৈবিক কারণে ঘটে না। কম শিক্ষিত নারী, গ্রামীণ সমাজে বসবাসকারী নারী এবং যারা অল্প বয়সে বিয়ে বা সন্তান জন্ম দিয়েছেন, তারা ধারাবাহিকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। মেয়েদের শিক্ষার উন্নয়ন এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে প্রজনন স্বাস্থ্যের বাইরেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।
আইসিডিডিআর,বির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. আনিসুর রহমান বলেন, আর্লি মেনোপজকে শুধু প্রজনন জীবনের একটি ধাপ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একজন নারীর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে চিকিৎসকদের নারীর মেনোপজের বয়স সম্পর্কে জানতে হবে। এতে ঝুঁকিতে থাকা নারীদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার পরিকল্পনা করা সহজ হবে।
গবেষণায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও সব দেশের ধূমপানসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবু বিশ্বব্যাপী গবেষণায় ধূমপানকে সময়ের আগে মেনোপজের সঙ্গে সম্পর্কিত একমাত্র প্রতিষ্ঠিত জীবনধারাগত ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই নারীস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ধূমপান ত্যাগে সহায়তামূলক কার্যক্রম যুক্ত করার সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা হওয়ায় কোনো বিষয়কে সময়ের আগে মেনোপজের সরাসরি কারণ হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না। এছাড়া ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, পরিবেশগত প্রভাব এবং হরমোনভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ডিএইচএস জরিপে ধারাবাহিকভাবে না থাকায় সেগুলো বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি।
গবেষকেরা মেয়েদের শিক্ষায় আরো বিনিয়োগ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ, মানসম্মত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং সময়ের আগে মেনোপজের জৈবিক ও সামাজিক কারণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন।










