শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, বাংলাদেশের কৃষি আপাতদৃষ্টিতে মানুষকে খাদ্য জোগালেও বাস্তবে তা অসুস্থতা তৈরির ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মাটি ও পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে এবং মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

আজ রোববার (১৮ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলন’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ইশতেহারে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যকে গুরুত্ব দেয়ার দাবিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলন। কয়েকটি সংগঠন মিলে গঠিত এ প্ল্যাটফর্ম নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক ২০ দফা দাবি তুলে ধরে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য নিয়ে তেমন গবেষণা হয় না। নীতিনির্ধারকেরাও এ বিষয়ে গুরুত্ব দেন না। বরং শুধু উৎপাদন বাড়ানো ও প্রবৃদ্ধির কৃতিত্ব নেয়া হয়। এর ফলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। এতে কৃষি জমির মাটি ও পানির মান নষ্ট হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান কৃষি ব্যবস্থা খুব প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একদিকে ফসলের মাঠ ও মাছের ঘের, অন্যদিকে ইটভাটা। হাটে সার, কীটনাশক ও নানা যন্ত্রপাতির ব্যাপক বিক্রি হয়। এসব যন্ত্রে রাষ্ট্র ভর্তুকি দেয়। বালাইনাশক নামে রাসায়নিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সরকারের সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু এসব নীতিমালা কিভাবে তৈরি হয়, তা সাধারণ মানুষ তো জানেই না, কৃষকরাও জানেন না। বেশিরভাগ নীতিমালা ইংরেজিতে লেখা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদেরও এতে বড় ভূমিকা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, কৃষি নিয়ে সাধারণত শুধু উৎপাদনের অর্জনগুলোই তুলে ধরা হয়। বলা হয় খাদ্য উৎপাদন চার গুণের বেশি বেড়েছে। মৎস্য ও সবজি উৎপাদনও বেড়েছে। এসব খবর দেখে মানুষ মনে করে সব ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু কৃষকের আত্মহত্যার খবরও পাওয়া যায়। এসব বিষয় নিয়ে কোনো হিসাব করা হয় না। কারণ এ নিয়ে গবেষণার জন্য তহবিল আসে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও আগ্রহ নেই যে কি মূল্যে এ উৎপাদন বাড়ছে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, শিশু মৃত্যুর হার কমেছে বলে কৃতিত্ব নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ৪০ বছরের পর মানুষের মধ্যে অসংক্রামক রোগ বাড়ছে। হৃদরোগ, মস্তিষ্কের রোগ, কিডনি ও লিভারের সমস্যা, এমনকি স্নায়বিক রোগও বাড়ছে। এসবের সঙ্গে পরিবেশ দূষণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এতে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে গড় আয়ু পুনর্মূল্যায়ন করলে তা কমে যেতে পারে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যহানির হিসাব না করা হয়, তবে এটাকে সত্যিকারের উন্নয়ন বলা যাবে কি না। তার মতে, আমরা এক ধরনের মোহ ও বিপজ্জনক ঘোরের মধ্যে আছি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি পানি সম্পদ। মাটির ওপর ও নিচের পানি রক্ষা করে, প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচিয়ে কীভাবে বীজের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায়, সই বিষয়ে গবেষণা দরকার। কিন্তু দেশে সে ধরনের গবেষণা হয়নি। দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর দিকে বেশি জোর দেয়া হয়েছে। এতে মাটি ও পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

সংবাদ সম্মেলনে নিরাপদ, ন্যায্য, জলবায়ুসহিষ্ণু, লাভজনক, স্বাস্থ্যকর, দূষণমুক্ত, টেকসই ও সার্বভৌম কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, কৃষক পরিচয়কে মর্যাদাসহ স্বীকৃতি দেয়া; কৃষিজমির শ্রেণী, সীমানা ও মালিকানা স্পষ্ট করে অকৃষি কাজে ব্যবহার বন্ধ করা; মাটির গঠন ও কেঁচোসহ অনুজীব ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন চাষাবাদ ও উপকরণ নিষিদ্ধ করা; ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর সেচ ও দূষণ বন্ধ করে প্রাকৃতিক পানিনির্ভর সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা; জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো এবং রাসায়নিক সার ধীরে ধীরে বন্ধ করা; অতি বিপজ্জনক কীটনাশক নিষিদ্ধ করা এবং সব ধরনের কীটনাশকের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা।

এ ছাড়া ফসলের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করে এলাকাভিত্তিক কৃষকের হাট গড়া, কৃষি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও কৃষক পেনশন চালু, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে স্বাস্থ্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, দেশীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ জাত সংরক্ষণ করে গ্রামীণ খামার জোরদার করা, নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য বিষয়কে শিক্ষাক্রমে যুক্ত করা, কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করা, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ কৃষিখাত গড়ে তোলা, কৃষি ফসলের বীমা ও কৃষকের ঝুঁকি ভাতা চালু এবং কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড চালুর দাবি জানানো হয়।