প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের অ্যাকসেস টু জাস্টিস বা ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।

তিনি বলেছেন, ন্যায়বিচার প্রাপ্তি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী, যা জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের সাত অনুচ্ছেদের প্রতিফলন। বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, অ্যাকসেস টু জাস্টিস প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক অর্থের অভাবে আইনের আশ্রয় বা ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত থাকবে, এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য নয়।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আমাকেও দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। তখন কারাগারে অনেকে ছিলেন— যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ার কারণে বছরের পর বছর বিনা বিচারে সেখানে থাকতে বাধ্য হয়েছেন।

ন্যায়বিচার যেকোনো রাষ্ট্র ও সমাজের অগ্রগতি ও শান্তির ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব যুগেই মানুষ বৈষম্যহীন সমাজ চেয়েছে, চেয়েছে সমমর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বসবাস করার নিশ্চয়তা। পারস্পরিক আস্থা, সহমর্মিতা ও সমতা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের জন্য অপরিহার্য।

তিনি বলেন, ন্যায়বিচার শুধু আদালত বা আইনের বিষয় নয়, এটি একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূল শক্তি। আমরা বিশ্বাস করি যে, রাষ্ট্রে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার নেই, সেই দেশ কখনো মানবিক রাষ্ট্র হতে পারে না। দীর্ঘ দেড় দশক পর মানুষ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এ যাত্রা সুসংহত করতে রাষ্ট্রে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

রাষ্ট্রের সব নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন মানুষও যেন অর্থের অভাবে অ্যাকসেস টু জাস্টিস থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার লিগ্যাল এইড কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, একজন ভুক্তভোগী যেন কেবল টাকার অভাবে আইনজীবীর সহায়তা নিতে না পারায় বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, সরকার সেই চেষ্টা করছে। ন্যায়বিচারের কথা শুধু আইনের বইয়ে নয়, প্রতিটি মানুষের জীবনে বাস্তব হয়ে উঠুক, এটি বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা।

বিচার কখনোই কেবল আদালত কেন্দ্রিক কোনো প্রক্রিয়া নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি একটি জীবন্ত মূল্যবোধ, যা রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যায়পরায়ণতা তখনই কার্যকর হয়ে ওঠে যখন আইন মানুষের ওপর প্রয়োগের হাতিয়ার না হয়ে বরং তাদের মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণের নৈতিক রূপ নেয়।

তিনি বলেন, যেহেতু ন্যায়বিচার প্রাপ্তি প্রতিটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার এবং সবাই যেন এর চর্চা করতে পারে, সেজন্য সরকার তাদের যথাযথ লিগ্যাল এইড দেবে এবং এ লক্ষ্যে সরকার সংশ্লিষ্ট বিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনেছে।

ন্যায়বিচারে বিলম্ব মানেই বিচার অস্বীকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বাস্তবতা মাথায় রেখে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সরকার মামলা শুরুর আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করেছে। এই ব্যবস্থায় এরই মধ্যে কয়েক হাজার বিরোধ কম সময়ে ও স্বল্প টাকায় আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস বা বছরের পরিবর্তে স্বল্প সময়ে কয়েক বৈঠকে সমস্যার সমাধান হয়েছে, এতে আদালতের ওপর চাপ কমেছে এবং সরকারের খরচও হ্রাস পেয়েছে।

তিনি বলেন, সঠিক সময়ে মানুষ পরামর্শ না পেলে সাধারণ বিরোধ বড় আকার ধারণ করে এবং মানুষ বিচারবিমুখ হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সরকার লিগ্যাল এইডকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করার ওপর জোর দিচ্ছে।

সরকারের প্রতি জনগণকে আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের মনে আস্থা থাকতে হবে যে, যেকোনো প্রয়োজনে রাষ্ট্র তাদের পাশে রয়েছে এবং লিগ্যাল এইড সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন হয়ে উঠবে। আসুন সবাই মিলে একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলি, যেখানে ন্যায়বিচার হবে শেষ কথা।

অনুষ্ঠানে সেরা প্যানেল আইনজীবী হিসেবে ঢাকার সায়েম খান ও রাজশাহীর নীলিমা বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ক্রেস্ট ও সম্মাননা গ্রহণ করেন।

এছাড়া সারা দেশে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি সেল ব্র্যাককে মনোনীত করা হয়। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা পত্র ও ক্রেস্ট গ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে আইন মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, আইনগত সহায়তা অধিদফতরের মহাপরিচালক মনজুরুল হাসান প্রমুখ বক্তব্য দেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ অন্য অতিথি উপস্থিত ছিলেন।