স্বজন যতদূরেই থাকুক; মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে যোগাযোগ করা যাচ্ছে মুহূর্তের মধ্যেই। সরাসরি কথা বলার পাশাপাশি ভিডিও কলে একে অন্যের ভাবভঙ্গিমা দেখতে-পড়তে পারছে সহজেই। ব্যক্তিগত চিঠি লেখার দিন ও প্রয়োজন দুটোই ফুরিয়েছে। স্বজনের পাঠানো চিঠির প্রতীক্ষায় কাউকে বসে থাকতে হয় না দিনের পর দিন। কাঁধে ঝোলা নিয়ে বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করা ডাক হরকরাদেরও এখন আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। 

সঞ্চয়পত্র কেনাবেচা আর রাষ্ট্রীয় চিঠি চালাচালির মাধ্যম হিসেবেই সীমিত হয়ে এসেছে ডাক বিভাগের কাজ। অনলাইন কেনাকাটার প্লাটফর্ম দারাজের সঙ্গে চুক্তি থাকায় কিছু পণ্য আনা-নেয়ার কাজও করা হয়। এর বাইরে গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সাত ডাকঘরে আর তেমন কোনো কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি। গত দুই বছরে আসেনি কোনো ব্যক্তিগত চিঠিও। আগের মতো মানি অর্ডারও তেমন একটা কেউ পাঠায় না। 

উপজেলার করেরহাট বিভাগীয় ডাকঘরে সেবা নিতে এসেছিলেন আনোয়ারা বেগম নামে এক গ্রাহক। ডাকঘরে এসেছেন মূলত সঞ্চয়পত্র লেনদেনের কাজে। ডাকঘরের মাধ্যমে চিঠি পাঠান বা পান কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটের যুগ। চিঠি লিখতে যাব কোন দুঃখে?’

মিরসরাই উপজেলার সাত বিভাগীয় ডাকঘরে কর্মচাঞ্চল্য নেই বললেই চলে। ব্যক্তিগত চিঠি আসছে না দুই বছর ধরে। শুধু রাষ্ট্রীয় চিঠিগুলো নিয়মিত চালাচালি হচ্ছে।

মিরসরাই উপজেলা বিভাগীয় ডাকঘর সূত্রে জানা গেছে, ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় সাতটি বিভাগীয় ডাকঘর রয়েছে। এগুলো হলো আবুতোরাব বাজার ডাকঘর, মিরসরাই উপজেলা ডাকঘর, করেরহাট ডাকঘর, মহাজনহাট ডাকঘর, জোরারগঞ্জ ডাকঘর, বিশ্বদরবার ডাকঘর ও ভরদ্বাজহাট ডাকঘর। এসব ডাকঘরের অধীনে ৩২টি উপডাকঘর রয়েছে। তবে সাতটি বিভাগীয় ডাকঘরের মধ্যে স্থায়ী ভবন রয়েছে ছয়টির। উপজেলা ডাকঘরে সরজমিনে দেখা যায়, সেবাগ্রহীতার চেয়ে কর্মকর্তা বেশি।

 দু-একজন গ্রাহক সঞ্চয়পত্রের লেনদেন করতে এসেছেন। আগে মানি অর্ডারের পরিমাণ বেশি থাকলেও বিকাশ, নগদ ও ব্যাংকিং লেনদেনের কারণে এখন তেমন একটা মানি অর্ডার হয় না বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। তবে অনলাইন শপ দারাজের সঙ্গে ডাক বিভাগের চুক্তি হওয়ায় কিছু পার্সেল ডাকঘরগুলোয় আসছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরসরাই উপজেলা ডাকঘরের এক কর্মকর্তা জানান, ধীরে ধীরে ডাক বিভাগের জমি বেহাত হয়ে যাচ্ছে। এ ডাকঘরের প্রায় ১৫ শতাংশ জমি বেদখল হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় একটি সূত্র। সরকার জমিগুলো উদ্ধার করে সংরক্ষণ করলে ডাক বিভাগের কাজে লাগত বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলী গ্রামের বাসিন্দা নটবর দত্ত বলেন, ‘আগে আমাদের গ্রামের অনেক প্রবাসীর চিঠি বারইয়ারহাটে আমার কৌশল্যা ঔষধালয়ের ঠিকানায় আসত। পিয়ন এসে চিঠিগুলো দোকানে রেখে যেত। পরে গ্রাহক এসে চিঠিগুলো নিয়ে যেত। কয়েক বছর ধরে পিয়ন আর চিঠি নিয়ে আসে না।’

অন্যদিকে ৩২টি উপডাকঘরের অবস্থা খুবই নাজুক। মাঝে মাঝে উপডাকঘরগুলো খোলা থাকে। কোনো কার্যক্রম না থাকায় পিয়ন নিয়মিত থাকে না উপডাকঘরগুলোয়।

আবুরহাট বাজারে অবস্থিত উপডাকঘরের কর্মকর্তা সুজাউল হক বলেন, ‘এখন চিঠি আসে না। তবু সকালে এসে ডাকঘরটি খুলে দুপুর পর্যন্ত বসে থাকি। যদি কোনো রাষ্ট্রীয় চিঠি থাকে, সেগুলো বিতরণ করি।’

জানতে চাইলে মিরসরাই উপজেলা ডাকঘরের পোস্টমাস্টার গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘ডাক বিভাগ একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ডাক বিভাগের সুবিধা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়েছে, যেখানে কুরিয়ার সার্ভিস পৌঁছতে পারেনি। তবু ভুগছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ বিভাগ। গত এক-দুই বছরে একটি ব্যক্তিগত চিঠিও আমার ডাকঘরে আসেনি। তবে রাষ্ট্রীয় চিঠি এসেছে নিয়মিত।’