হবিগঞ্জে পরিবহন শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। এর মধ্যে জেলা প্রশাসন থেকে ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন মাত্র ৩০০ শ্রমিক। বাকিরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ত্রাণ পেতে মরিয়া শ্রমিকরা ঘুরছেন শ্রমিক নেতাদের দ্বারে দ্বারে। শ্রমিকদের ত্রাণের তালিকায় নাম উঠিয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে স্থানীয় শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে।

একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের পরিবহন শ্রমিক নেতাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে। সাধারণ শ্রমিকদের অভিযোগ, কয়েকদিন আগে পরিবহন শ্রমিকদের একটি পক্ষ ত্রাণ দেয়ার কথা বলে ১০০ টাকা করে নেয় তাদের কাছ থেকে। কিন্তু এখনো ত্রাণ পাননি তারা। পরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছেন ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।

দেশে গণপরিবহন বন্ধ এক মাস ধরে। কর্মহীন প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক। প্রকট হচ্ছে খাদ্য সংকট। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি জেলার পরিবহন শ্রমিকদের সহায়তা করা হচ্ছে। সেটাও পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর দেয়া তালিকা ধরে। অভিযোগ উঠেছে, ত্রাণের তালিকায় নাম ওঠানোর কথা বলে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন স্থানীয় অনেক শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মী। পরিবহন শ্রমিকদের পাশাপাশি এ রকম একটি অভিযোগ এসেছে শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কাছ থেকেও।

শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সংগঠনের নামে পরিবহন শ্রমিকদের ত্রাণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে দেয়ার কথা বলছেন কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি। এ সময় তারা শ্রমিকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি শ্রমিকভেদে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করছেন এ অসাধু চক্রের সদস্যরা। পুরো প্রক্রিয়াটিকে প্রতারণামূলক উল্লেখ করে চক্রটিকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা।

বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বণিক বার্তাকে বলেন, এ দুর্যোগে কর্মহীন শ্রমিকদের দুর্দশার সুযোগ নিয়ে যারা পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন ও তাদের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন, তাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে।

এ সময় জেলা প্রশাসকদের শুধু রেজিস্টার্ড শ্রমিক ইউনিয়নের দেয়া তালিকা ধরে শ্রমিকদের ত্রাণ সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তবে ফেডারেশনের এ শীর্ষ নেতা যখন ত্রাণের তালিকায় নাম তুলে দেয়ার কথা বলে প্রতারণার অভিযোগ তুলছেন, তখন পরিবহন শ্রমিকদের অনেকেই সংগঠনটির শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের টাকার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফেডারেশনের শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা জমা আছে। পরিবহন শ্রমিকরা যখন ‘অনাহারে-অর্ধাহারে’ দিন পার করছেন, তখন সংগঠনটির নেতারা বলছেন, নিয়োগপত্র না থাকায় কল্যাণ ফান্ডের টাকা এ দুর্যোগকালে শ্রমিকদের দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে ‘আইনি জটিলতার’ কথা বলছেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়েছে। তবে ঘটনাটিকে ফেডারেশনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতা শাজাহান খান। তিনি এ বিষয়ে বলেন, ইউনিয়নের চাঁদায় গঠিত তহবিলের অর্থ দিয়ে সংগঠন পরিচালনার পাশাপাশি শ্রমিকের মৃত্যু, পারিবারিক অসচ্ছলতা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ বা শ্রমিকদের সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনে ব্যয় করা হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশের ৫০ লাখের বেশি পরিবহন শ্রমিক অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। এ বিপুল পরিমাণ শ্রমিককে আর্থিক সহায়তা দেয়ার মতো সামর্থ্য বাংলাদেশের কোনো সংগঠনের নেই।

সবকিছু জেনে-বুঝেও একটা গোষ্ঠী পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের বর্তমান নেতাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।