বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী শেষ হতে না হতেই শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ দুটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত ঘটনা সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। প্রায় সব দেশেই দেখা দিয়েছে মূল্যস্ফীতি, বেড়েছে আমদানি ও ভোগ্যপণ্যের দাম। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এর কিছুটা প্রভাব পড়লেও এখনো অর্থনীতি স্থিতিশীল রয়েছে।

গতকাল সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত ‘বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাংলাদেশের বাস্তবতা’ শীর্ষক সেমিনারে আলোচকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এসব বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজিত এ সেমিনারে মুখ্য আলোচক হিসেবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান।

সেমিনার কমিটির আহ্বায়ক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. সুলতান-উল-ইসলামের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক (অব.) মো. ওবায়দুর রহমান প্রামাণিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন।

সেমিনারে অন্যদের মধ্যে রাবির বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা, অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াদুদ, রাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, রাবি অর্থনীতি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি আরিফুল হক কুমার প্রমুখ অংশ নেন।

মুখ্য আলোচক অধ্যাপক আতিউর রহমান বলেন, নানামুখী সংকটের মধ্যে আছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। মহামারীর কারণে খাদ্য সংকটসহ শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহে সংকট ছিল। সাপ্লাই চেইনগুলো ঝুঁকিতে ছিল। মহামারীর প্রকোপ কমে আসায় পুনরুদ্ধার শুরু হতে না হতেই শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ফলে সাপ্লাই চেইনগুলোয় ব্যাপক ঝুঁকি সৃষ্টির মাধ্যমে খাদ্য ও কৃষিপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের মূল্য বেড়েছে। সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপে পড়েছে মানুষ।

তিনি আরো বলেন, বৈশ্বিক এ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় গত ১২ মাসে প্রায় সব দেশের নিজস্ব মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে। এর মধ্যে চীনের মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৫ শতাংশ, ভারতে ডলারের বিপরীতে রুপির দাম কমেছে ৬, যুক্তরাজ্যের পাউন্ডের দাম কমেছে ১২, ইউরোর আরো বেশি, প্রায় ১৪ শতাংশ। এমন সংকটের দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক দশকগুলোয় বিরল। এপ্রিল ২০২০ থেকে মার্চ ২০২২—এ সময়কালে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে চার গুণ, সারের দাম বেড়েছে ২২০ শতাংশ, যা তিন গুণেরও বেশি। যেসব খাদ্যপণ্য রাশিয়া ও ইউক্রেনে বেশি উত্পন্ন হয় সেগুলোর দাম বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির চাপ দক্ষিণ এশিয়ায় কিছুটা বেশি। শ্রীলঙ্কা ও ভারতের কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স ইনফ্লেকশন ২১ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ বৃদ্ধি তুলনামূলক কম। তবু ৬ শতাংশ পেরিয়ে গেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৩ শতাংশের চেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ গভর্নর আরো বলেন, বিশ্বের এ সংকটের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। দেশে পণ্য আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। খাদ্যসহ অনেক নিত্যপণ্য ও রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামালের জন্য বাংলাদেশকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় রফতানি এখন পর্যন্ত বর্ধিষ্ণু থাকলেও মন্দার কারণে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশেষ করে বিপাকে পড়েছে তুলনামূলক কম আয়ের মানুষরা। একদিকে আমদানি কমানোর চাপ রয়েছে অন্যদিকে পুনরুদ্ধার বেগবান রাখা দরকার।

ড. আতিউর রহমান আরো বলেন, কৃষি আমাদের অর্থনীতির রক্ষাকবচ। তাই কৃষির বিকাশ নিশ্চিত করতে বাজেটে উদ্যোগ রাখতে হবে। কৃষি ভর্তুকি তিন গুণ বাড়িয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা করতে হবে। কৃষি সংশ্লিষ্ট সরকারি জনবলের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ব্যক্তিগত ও ব্যক্তি খাতে যারা কৃষি গবেষণা করছেন, তাদের জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। আইসিটি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি বাজারজাতে ও তথ্য আদান-প্রদান বাড়াতে হবে। কৃষি অবকাঠামো ও অনলাইনে কৃষি বাজারজাতকরণ বাড়াতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।