অপেক্ষা ও নানা জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শুরু হয়েছে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। মৌসুমের প্রথম দিনে ৮৩৭ জন পর্যটক নিয়ে দ্বীপের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে এমভি বার আউলিয়া। এতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি, আর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হওয়ায় উচ্ছ্বসিত পর্যটকেরা। তবে যাত্রার প্রথম দিনেই টিকিটের বাড়তি দাম ও ভোগান্তি নিয়ে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন পর্যটক। অন্যদিকে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঘাটে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, পলিথিন ও সাউন্ডবক্স বহনে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে আজ সকাল সাড়ে ৭টায় ৮৩৭ যাত্রী নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করে এমভি বার আউলিয়া। এর আগে ভোর ৬টা থেকেই ঘাটে জড়ো হতে থাকেন পর্যটকরা।
সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঘাটে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা। এসময় পর্যটকদের সঙ্গে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও সাউন্ডবক্স জাহাজে নিতে বাধা দেয়া হয়। পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরিতে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে মাইকিংও করা হয়।
সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘আজ ৮৩৭ যাত্রী নিয়ে এ মৌসুমের প্রথম জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে বাকি জাহাজগুলো চলাচল করবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। দ্বীপের কেয়াবনে প্রবেশ, ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়া, পার্টি আয়োজন ও উচ্চ শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই করা যাবে না।
পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, প্রথম দিনে প্রায় ৮৩৭টি টিকিট বিক্রি হয়েছে, যা জাহাজটির মোট ধারণক্ষমতার সমান। পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের নির্দেশনা এবং প্লাস্টিক ও সাউন্ডবক্স বহন না করার বিষয়ে পর্যটকদের সচেতন করা হয়েছে।

এদিকে মৌসুমের প্রথমবার সেন্টমার্টিন যাওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন পর্যটক কফিল আনোয়ার ও তার পরিবারের সদস্যরা। তিনি বলেন, আগে কখনো সেন্টমার্টিন যাওয়া হয়নি। এবার প্রথমবারের মতো দ্বীপে যাচ্ছেন। মৌসুমের প্রথম দিন হওয়ায় আনন্দ ও উত্তেজনা আরো বেশি।
তবে যাত্রার আনন্দের মধ্যেও ভোগান্তির অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন পর্যটক। ঢাকার সাভার থেকে আসা পর্যটক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অনলাইনে টিকিট কেটে ভুলে প্রিন্ট কপিটি রেখে এসেছি। তবে টিকিটের বার্তা মোবাইলে ছিল। প্রথমে এসেও জাহাজে উঠতে পারিনি। পরে অনেক বুঝিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে জাহাজে উঠতে পেরেছি।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকা-বরিশাল অনেক দীর্ঘ নৌপথ। সেখানে এত টাকা ভাড়া নয়। কিন্তু এখানে টিকিটের দাম অনেক বেশি ধরা হয়েছে।’
স্কোয়াব সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে তিনটি জাহাজ। এগুলো হলো এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফ। তিনটি জাহাজের মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ার ধারণক্ষমতা ৮৫০, এমভি কর্ণফুলির ৭৩২ এবং এমভি টেকনাফের ৭১৬ জন।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, এমভি বার আউলিয়া সকাল ৭টায়, এমভি কর্ণফুলী সকাল সোয়া ৭টা এবং এমভি টেকনাফ সকাল সোয়া ৮টায় নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা। ফিরতি যাত্রায় জাহাজ তিনটি বিকাল সাড়ে ৩টায় সেন্টমার্টিন ঘাট থেকে ছাড়বে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এসময় দ্বীপে ভ্রমণের পাশাপাশি ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের রাতযাপনের সুযোগ থাকছে। দ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। এছাড়া ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দ্বীপে বেশ কিছু বিধিনিষেধও বহাল রয়েছে। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি আয়োজন নিষিদ্ধ। একইসঙ্গে কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়-এমন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম ঘিরে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পর্যটকের আগমন বাড়লে দ্বীপের হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন ব্যবসায় গতি ফিরবে। একইসঙ্গে পর্যটননির্ভর দ্বীপবাসীর কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগ বাড়বে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দ্বীপের মানুষের মুখেও হাসি ফুটবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।












