নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধি গেজেট আকারে গ্রহণের ২০১৮ সালের আপিল বিভাগের আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। আজ রোববার (২৯ জুন) প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ছয় বিচারপতির বেঞ্চ রিভিউ শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে আপিল করার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

আদালতে রিভিউ আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।

আদালতের আদেশের পর শিশির মনির বলেন, ২০১৮ সালের গেজেট গ্রহণের আদেশ স্থগিত হওয়ায় সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে হাইকোর্টে চলমান রুলের শুনানি ও নিষ্পত্তিতে আর কোনো বাধা রইল না। তিনি জানান, গেজেটটি কার্যকর থাকায় কোনো প্রশাসনিক শূন্যতাও তৈরি হবে না।

বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশের আগে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। আইন মন্ত্রণালয় খসড়া তৈরি করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা আপত্তি জানান। তিনি বলেন, খসড়াটি ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী বিধিমালার মতো হওয়ায় এটি মাসদার হোসেন মামলার রায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিছু শব্দ ও বিধি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। পরে খসড়া সংশোধন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে গেজেট প্রকাশ স্থগিত থাকে। এ সময় ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর সমালোচনার মুখে পড়ে প্রধান বিচারপতি সিনহা দেশত্যাগ করেন ও পদত্যাগপত্র দেন।

এর আগে, ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধি গেজেট আকারে গ্রহণের আদেশ দেন। সেই আদেশের বিরুদ্ধে আটজন আইনজীবী রিভিউ আবেদন করেন। সে সময় ড. কামাল হোসেন, রফিক-উল হক, এম আমীর-উল ইসলাম, মইনুল হোসেন, এ এফ হাসান আরিফ ও ফিদা এম কামালের মতো বিশিষ্ট আইনজীবীরা বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ নিয়ে বিতর্কের মূল রয়েছে মাসদার হোসেন মামলার রায়ে। ১৯৯৪ সালে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড একধাপ নামিয়ে দেয়া হলে মাসদার হোসেনসহ ২১৮ জন বিচারক হাইকোর্টে রিট করেন। ১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে ও বিসিএস ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির বৈধতা নিয়ে রুল জারি করে। ১৯৯৭ সালের ৭ মে হাইকোর্ট বিচার বিভাগকে স্বতন্ত্র সার্ভিস ঘোষণার নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে চূড়ান্ত রায় দেন।

ওই নির্দেশনায় বলা হয়, বিচার বিভাগ অন্যান্য সিভিল সার্ভিস থেকে আলাদা থাকবে, নির্বাহী হাকিমরা বিচারিক কাজ করতে পারবেন না, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন করতে হবে, রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং বাজেট প্রণয়নে সুপ্রিম কোর্টের সম্পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে। এই নির্দেশনার মূল অংশ ২০০৭ সালে বাস্তবায়িত হলেও শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশ ঝুলে থাকে।

শুনানিতে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সরকার বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে গেজেট গ্রহণের আদেশ দিতে বাধ্য করেছিল। তাই দ্রুত রিভিউ করা জরুরি ছিল ও আদালতের অনুমতি নিয়ে রিভিউ আবেদন করা হয়।