দেশের উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় লবণাক্ততার সমস্যা দীর্ঘদিনের। ফলে ওই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ যে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে, জমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে এ তথ্যও পুরনো। কিন্তু মিষ্টিপানির এলাকা হিসেবে পরিচিত যশোরের পানিতেও লবণের আগ্রাসন বেড়েছে। এমনকি কোনো কোনো এলাকায় মানুষের শরীরে ও খাবার পানিতে লবণের গ্রহণযোগ্য মাত্রা পার হয়ে গেছে।

যশোর বিএডিসি (সেচ) সূত্র মতে, পানিতে লবণাক্ততার সহনীয় মাত্রা হচ্ছে প্রতি সেন্টিমিটারে ৬৭০ মাইক্রো সিমেন্স। দেশের উপকূলবর্তী বাগেরহাট, সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর এবং খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিতে লবণাক্ততার এ সহনীয় মাত্রা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। উপকূলীয় অঞ্চল না হলেও যশোরের পানিতে লবণের আগ্রাসন বেড়েছে। বিশেষ করে জেলার মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার পানিতে লবণাক্ততার অনুপ্রেবশ উদ্বেগজনক পর্যায়ে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববদ্যালয়ের পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কে. এম. দেলোয়ার হোসেন বলেন, মানুষের শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণের প্রয়োজন এবং সেটি আসে খাদ্য ও পানি থেকে। পানিতে লবণের পরিমাণ বেশি। এই পানি শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিএডিসি এ অঞ্চলের পানিতে আর্সেনিক, লবণাক্ততার তথ্য সংগ্রহে যশোরের আট উপজেলায় পর্যবেক্ষণ নলকূপ স্থাপন করেছে। সেখান থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ ডাটা সার্ভারে যুক্ত হয়। এ প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রকৌশলী সোহেল হাসান জানান, ২০১৬ সালে কেশবপুরের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ছিল প্রতি সেন্টিমিটারে ৮৭৯ মাইক্রো সিমেন্স, যা সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০৯ মাইক্রো সিমেন্স বেশি। ২০২১ সালে লবণাক্ততার সহনীয় মাত্রার দ্বিগুণ পেরিয়ে যায়। গেল বছরের আগস্ট মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, পানিতে লবণাক্ততা প্রতি সেন্টিমিটারে ১ হাজার ৪৩০ মাইক্রো সিমেন্স শনাক্ত হয়।

এদিকে মণিরামপুরের বিষয়েও বিএডিসির (সেচ) তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে উদ্বেগজনক তথ্য। ২০২১ সালে পর্যবেক্ষণ নলকূপ থেকে ডাটা লগারে জমা হওয়া তথ্য মতে, সেখানকার পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা হচ্ছে প্রতি সেন্টিমিটারে এক হাজার ৬১ মাইক্রো সিমেন্স, যা সহনীয় মাত্রার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। একইভাবে সহনীয় মাত্রার লিমিট ক্রস করেছে অভয়নগরে। পাঁচ বছরের বেশি সময় সেখানকার পানিতে লবণাক্তার মাত্রা প্রতি সেন্টিমিটারে ৯০০-১০০০ মাইক্রো সিমেন্স।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববদ্যালয়ের পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইবুর রহমান মোল্যা বলেন, জলবায়ুর কারণে বিভিন্ন দুর্যোগের সময় সমুদ্রের পানি এখন নদী ও ভবদহ এলাকায় ঢুকছে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করলেও বের হতে পারছে না।

এদিকে পানিতে লবণাক্ততা বাড়ায় জনস্বাস্থ্য ও ফসল হুমকির মুখে থাকলেও বড় কোনো পদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্টদের। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতি গ্রামে দুই/তিনটি করে নলকূপ স্থাপনে কাজ শুরু হয়, যা অত্যন্ত অপ্রতুল।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদ পারভেজ জানান, নিরাপদ পানি ব্যবহারে ‘সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ’ নামে একটি প্রকল্পের অধীনে প্রতি ইউনিয়নে ২৬টি করে নলকূপ স্থাপন করার কাজ চলমান।  যে এলাকায় আর্সেনিক বা লবণাক্ততা বেশি; সেখানকার নলকূপে এক ধরনের ফিল্টার বসিয়ে পানি নিরাপদ করা হয়।