নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ভারতের সঙ্গে ১৪ দিনের জন্য সীমান্ত বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশ। যদিও দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরেও। তবে ভারতে সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা। এজন্য সংক্রমণ প্রতিরোধে আপাতত বন্দর বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন এলাকাবাসী।
গতকাল সরেজমিনে হিলি স্থলবন্দর ঘুরে দেখা যায়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শূন্যরেখায় স্থাপন করা হয়েছে জীবাণুনাশক টানেল। ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশ সীমান্তে আসামাত্র চালক ও হেলপারদের এ টানেলে প্রবেশ করিয়ে স্যানিটাইজড করা হচ্ছে। পরে তাদের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। একইভাবে বন্দরে প্রবেশের ক্ষেত্রেও পুনরায় চালক ও হেলপারদের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। জীবাণুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে ট্রাকের চাকাগুলোতেও। বন্দরের ভেতরে বাংলাদেশী ট্রাক প্রবেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
এছাড়া বন্দরের ভেতরে প্রবেশের ক্ষেত্রে শ্রমিকসহ সবাইকে বন্দরের প্রবেশপথে হাত ধুয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সেখানে তাদের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। তবে বন্দরের ভেতরের অন্য কার্যক্রমগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিপালন করা সম্ভব হচ্ছে না। শ্রমিকদের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক হলেও অনেকেই তা করছেন না। আবার ভারতীয় ও বাংলাদেশী চালক একসঙ্গে মাস্ক ছাড়াই বসে থাকছেন, গল্প করছেন।
এ অবস্থায় স্থানীয়রা বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে আপাতত বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধ রাখা উচিত। বন্দর বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন হাকিমপুর (হিলি) পৌরসভার মেয়র জামিল হোসেন চলন্তও। এজন্য জেলা প্রশাসকের কাছে স্থানীয়দের দাবির বিষয়টি জানিয়েছেন তিনি।
হিলির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে সংক্রমণের এ শঙ্কার কথা জানা যায়। তাদেরই একজন আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, ভারতে করোনা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে সংক্রমণ বেশি শোনা যাচ্ছে। সেখানে নাকি আরো ভয়ানক অবস্থা। পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে আমরা ভারতের সবচেয়ে কাছে। সীমান্তবর্তী হিলির বাসিন্দা হওয়ায় আরো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। যদিও সরকার ১৪ দিন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বন্ধ রেখেছে। তবে বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি চালু রয়েছে। তাই ভারতে করোনা মহামারীর এমন সময়ে বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধ রাখলে সংক্রমণ থেকে বাঁচতে পারি। আমাদের দাবি, হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে যাত্রী পারাপার যেমন বন্ধ রয়েছে, তেমনি বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানিও যেন বন্ধ রাখা হয়।
দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর গত বছরের মার্চ থেকেই হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে দুই দেশের মাঝে যাত্রী পারাপার বন্ধ রয়েছে। আর ভারতে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ২৬ এপ্রিল থেকেই দুই সপ্তাহের জন্য দেশের সব সীমান্ত বন্ধ করে দেয় সরকার। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা হয়।
হিলি স্থলবন্দরে পণ্য নিয়ে আসা ভারতীয় ট্রাকচালক বাদল রায় বলেন, পণ্য নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় দুবার আমাদের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। স্যানিটাইজ করা হচ্ছে। এছাড়া আমরা মাস্ক পরেই বন্দরে প্রবেশ করছি। বন্দরের ভেতরে সবাই একসঙ্গে বসে থাকছি। তবে এ সময় গরমের কারণে মাস্ক খুলে রাখতে হচ্ছে।
এদিকে বন্দরের শ্রমিকদের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার প্রবণতা দেখা গেছে। অনেকেই মাস্ক ব্যবহার করছেন না। তাদেরই দুজন হিলি স্থলবন্দরে কর্মরত শ্রমিক আসাদুল ইসলাম ও মেহের আলী। তাদের ভাষায়, শ্রমিকের কাছে করোনা বলে কোনো কিছু নেই। আর মাস্ক পরে পণ্য লোড-আনলোড করতে খুব সমস্যা হয়। মাস্ক পরে থাকলে অতিরিক্ত গরমের কারণে ঘামে ভিজে যান তারা। দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, যার কারণে তারা মাস্ক ছাড়াই কাজ করেন।
বন্দরে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের বিষয়ে কথা হয় হিলি স্থলবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেনের সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধিসহ সরকারি অন্য সব নির্দেশনা মেনে বন্দর দিয়ে দুই দেশের মাঝে পণ্য আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কার্যক্রম চালু রয়েছে। ট্রাকগুলোতে জীবাণুনাশক স্প্রে ছিটানো হচ্ছে। ভারতীয় ও বাংলাদেশী ট্রাকের চালক ও হেলপারদের স্যানিটাইজড করা হচ্ছে। তাপমাত্রা পরিমাপ করে বন্দরে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। বন্দরে প্রবেশের ক্ষেত্রে শ্রমিকসহ অন্য সবার জন্য প্রবেশমুখে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে হাত ধুয়ে ও তাপমাত্রা পরিমাপ করেই বন্দরের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রে সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবির বিষয়ে হাকিমপুর পৌরসভার মেয়র জামিল হোসেন চলন্ত বলেন, আমরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানতে পারছি, বর্তমানে করোনায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। এ অবস্থায় পুরো বিশ্ব উদ্বিগ্ন। ভারতের সঙ্গে তারা ফ্লাইটসহ যোগাযোগ বন্ধ করে দিচ্ছে। যেহেতু এ পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫০-২০০ পণ্যবাহী ট্রাক ভারত থেকে প্রবেশ করছেন। এর সঙ্গে ৩০০-৪০০ চালক ও হেলপারও আসছে। তারা তো আর ঝুঁকির বাইরে না। সেজন্য স্থানীয়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে দুই দেশের মাঝে সাময়িকভাবে আমদানি-রফতানি বন্ধের দাবি জানিয়েছি। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এ দাবি জানানো হয়েছে।
তবে বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বন্ধের বিষয়ে স্থানীয় সরকারের কিছু করার নেই বলে জানিয়েছেন দিনাজপুর জেলা প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ জাকী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে দুই দেশের মাঝে লোক পারাপার বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্ত হচ্ছে পণ্য আসা-যাওয়া বন্ধ থাকবে না। এটি সরকারের নীতিনির্ধারণীর বিষয়। সেখানে আমাদের স্থানীয় প্রশাসন কিছু করতে পারবে না। হাকিমপুর পৌরসভার মেয়র সমন্বয় সভায় মৌখিকভাবে বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধের বিষয়টি বলেছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের এককভাবে কোনো কিছু করার নেই। নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।










