বাজারে নিত্যপণ্যের দাম এখনো ঊর্ধ্বমুখী। ডিম, ভোজ্যতেল ও আটা-ময়দার বাড়তি দামে হাঁসফাঁস ক্রেতারা। এক বছরের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম গড়ে ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

টিসিবির ওয়েবসাইটে গত বছরের ১ ও ২ অক্টোবরের ঢাকা মহানগরীর খুচরা বাজারদরের তথ্য পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবরের দরের সঙ্গে গতকালের বাজারদর তুলনা করে দেখা যায়, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল গতকাল ১৯০-১৯৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত বছরের ৩ অক্টোবর এর দাম ছিল ১৭২-১৭৮ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে খোলা সয়াবিন তেলের সর্বনিম্ন দাম বেড়েছে ১৮ টাকা বা ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

একই সময়ে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। গত বছরের ৩ অক্টোবর এটি ১৮৮-১৯০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল দাম ছিল ২০৪ টাকা। সর্বনিম্ন দর বিবেচনায় এক বছরে বেড়েছে ১৬ টাকা বা ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। দুই লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। গত বছরের অক্টোবরের শুরুতে দুই লিটারের বোতল ৩৭৫-৩৮০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল তা বেড়ে ৪১০ টাকা হয়েছে। সর্বনিম্ন দর বিবেচনায় এক বছরে দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা বা ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

নিম্ন আয়ের মানুষের বহুল ব্যবহৃত খোলা পাম অয়েলের দামেও স্বস্তি নেই। গত বছরের একই সময়ে প্রতি লিটার পাম অয়েল ১৫৩-১৬০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ১৭০-১৭৫ টাকা। সর্বনিম্ন দর বিবেচনায় এক বছরে দাম বেড়েছে ১৭ টাকা বা ১১ দশমিক ১১ শতাংশ।

গত বছরের তুলনায় খোলা আটার দাম বেড়েছে ১১ শতাংশের বেশি। গত বছর সর্বনিম্ন ৪৫ টাকায় বিক্রি হওয়া খোলা আটার দাম এবার ৫০ টাকা। তবে এ সময়ে খোলা ময়দার দাম বেড়েছে সর্বাধিক, ২৭ শতাংশের বেশি। সর্বনিম্ন ৫৫ টাকায় বিক্রি হওয়া খোলা ময়দা গতকাল ৭০ টাকায় বিক্রি হয়।

বাংলাদেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ডিম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য। তবে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ডিমের বাজার অস্থির। গত বছরের একই সময়ে প্রতি হালি ডিম ৪৫-৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা বেড়ে ৫০-৫৫ টাকা হয়েছে। ডজনপ্রতি দাম ১৩০-১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৫-১৬০ টাকায়। রাজধানীর বড় বাজারের তুলনায় ছোট বাজারগুলোয় ফার্মের লাল ডিম ডজনপ্রতি ১৬০-১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ছোট দোকানে খুচরা প্রতি পিস ডিমের দাম ১৪-১৫ টাকা।

গতকাল কারওয়ান বাজারে আসা তৌহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। মাছ, মাংস, সবজি ও তেল—সবকিছুরই দাম বেশি। একটি ডিম কিনতেও ১৩-১৪ টাকা খরচ হচ্ছে। খবরে পড়ছি মাথাপিছু আয় বাড়ছে, কিন্তু পকেট বলছে আমার আয় কমছে। আগে ১ হাজার টাকায় যে বাজার করতে পারতাম, এখন দেড় হাজার টাকায়ও তা করা যাচ্ছে না।’

গতকাল কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ সবজি কেজিপ্রতি ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিষ্টি কুমড়া ও পেঁপের দাম ৫০ টাকার নিচে থাকলেও কাঁচামরিচের দাম আবার কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা ছুঁয়েছে। খুচরা বাজারে প্রতি পোয়া কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা কমলেও মাছ ও অন্যান্য মাংসের বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় সবজির ক্ষতি হয়েছে। এতে কয়েকটি সবজির সরবরাহ কমে দাম বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজারদরে।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক বছরের ব্যবধানে নিত্যপণ্যের এতটা দাম বাড়া অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক। দেশে মূল্যস্ফীতি অত্যধিক, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই বৃষ্টি, ছুটির দিন বা বন্যাসহ নানা কারণকে দাম বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন। এখন জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর প্রভাব সব খাতেই পড়ে। ফলে পরিবহন মালিক-চালক ও ব্যবসায়ীরাও এটিকে দাম বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে পারেন। বাজারে সরকারের কার্যকর নজরদারি নেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার তদারকিতে সরকারের বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান আছে বলেও মনে হয় না।’