কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে আগামী মাসে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা সরকারের। এ লক্ষ্যে চলছে চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ। তবে এর নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় স্পিনিং রিজার্ভ (আপৎকালে ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র) নিয়ে রয়ে গেছে বড় ধরনের জটিলতা। আর এ সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট।
স্পিনিং রিজার্ভ বলতে এমন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাকে বোঝায়, যা ওই মুহূর্তে উৎপাদনে ব্যবহার না হলেও সবসময় প্রস্তুত অবস্থায় থাকে। কোনো কারণে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে এ রিজার্ভ সক্ষমতা তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদনে এসে গ্রিডের ঘাটতি পূরণ করবে। এতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় বা গ্রিড ধসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে স্পিনিং রিজার্ভ নিশ্চিতের জন্য গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহারের কথা বলেছিল রাশিয়ার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল সেন্টার অব ইউনিফায়েড পাওয়ার সিস্টেম (এসটিসি-ইউপিএস)। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বড় ইউনিট পরিচালনার ক্ষেত্রে এ ধরনের রিজার্ভ গ্রিডের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত স্পিনিং রিজার্ভ নেই। তবে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সে রিজার্ভ রয়েছে।
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। যদিও গ্যাস সংকটের কারণে এসব কেন্দ্রের অর্ধেক সক্ষমতা বছরের পর বছর বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রূপপুর চালুর ক্ষেত্রে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাড়তি সক্ষমতা প্রস্তুত করার মতো পরিস্থিতি নেই।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও পিজিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা যদিও বলছেন, রূপপুর ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্পিনিং রিজার্ভ রয়েছে। তবে প্রথম ইউনিটের পুরো বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের জন্য যে পরিমাণ স্পিনিং রিজার্ভ থাকা দরকার সেটি নেই। এ রিজার্ভ গ্রিডের জন্য অত্যন্ত জরুরি বলেও মনে করেন তারা।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞ ও বিদ্যুৎ বিভাগ-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রূপপুরের প্রথম ইউনিট চালুর ক্ষেত্রে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বাড়তি সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আট হাজার মেগাওয়াট জ্বালানি সরবরাহ থাকা জরুরি। বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আরো আড়াই হাজার মেগাওয়াট এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র রিজার্ভ রাখার ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন।
জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রিডে আসুক সেটা দ্রুত চাই। এখন সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত হয়েছে, যেটা আগে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হতো।’ স্পিনিং রিজার্ভ নিশ্চিত হওয়া গেছে কিনা সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রূপপুরের ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদনে যতটুকু স্পিনিং রিজার্ভ দরকার সেটাতে অসুবিধা হবে না।’
রূপপুর চালুর জন্য স্পিনিং রিজার্ভের বিষয়টি জানিয়ে গত বছরের জানুয়ারিতে বিদ্যুৎ বিভাগে চিঠি দেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসটিসি-ইউপিএস। ওই চিঠিতে বলা হয়, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিট জাতীয় গ্রিডে প্রতিস্থাপনের (সিনক্রোনাইজেশন) জন্য অতিরিক্ত ১ হাজার ৯০৭ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র রিজার্ভ রাখতে হবে। এর মধ্যে গ্রিডের প্রাথমিক ফ্রিকোয়েন্সি কন্ট্রোলের জন্য ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ও দ্বিতীয় ফ্রিকোয়েন্সি কন্ট্রোলের জন্য ৭০৭ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে বিকল্প হিসেবে রাখার পরামর্শ দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
ওই চিঠিতে এসটিসি তাদের সুপারিশে জানায়, প্রাইমারি ফ্রিকোয়েন্সি কন্ট্রোলের ক্ষেত্রে (এফজিএমও) গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়। আর সেটি হলে গ্যাসভিত্তিক অন্তত আট হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।
এর পর থেকে বিদ্যুতের স্পিনিং রিজার্ভ নিয়ে বিপিডিবির সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে বলে জানান পাওয়ার গ্রিডের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তারা বলেন, স্পিনিং রিজার্ভের জন্য ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জ, হরিপুর ও মেঘনাঘাটে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতের কথা বলেছি। কারণ এসব জায়গায় আমাদের গ্রিড লাইন অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে এসব স্পিনিং রিজার্ভ কেন্দ্রগুলোর জন্য এখনো গ্যাসের ব্যবস্থা করা যায়নি।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুর। এটি চালু হলে বাংলাদেশ ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হবে। বৃহৎ এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা গুরুত্বসহকারে নেয়া উচিত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চয়তা স্পিনিং রিজার্ভের অন্যতম শর্ত উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে স্পিনিং রিজার্ভ গোটা সিস্টেমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা ছাড়া সিকিউর অপারেশন অসম্ভব। বর্তমানে গ্যাস খাতে যে পরিস্থিতি চলছে, তাতে রূপপুরে স্পিনিং রিজার্ভ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র পরিকল্পনায় রাখা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ফলে এ ধরনের বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে নেয়ার ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আরো বেশি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।’
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। কমিশনের অধীনে পরিচালনার কাজটি করছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। পাবনার রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। এটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যার সিংহভাগ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া।










