বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মানুষের জীবন কেড়ে নেবে, মানুষকে ভোট দিতে দেবে না, নির্বাচন বন্ধ করবে, এত সাহস কোথা থেকে পায়! ওই লন্ডনে বসে হুকুম দেয়, আর কতগুলো লোক এখানে আগুন নিয়ে খেলে। আগুন নিয়ে খেলতে গেলে আগুনেই হাত পোড়ে, এটা তাদের মনে রাখা উচিত।’
সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় গতকাল প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নৌকার প্রথম নির্বাচনী জনসভায় এদিন সিলেট বিভাগের চার জেলার ১৯টি সংসদীয় আসনে নেতাকর্মীরা যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী সব আসনের দলীয় প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা।
বোমাবাজি, খুন ও আগুন-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘তারা মনে করেছে দুইটা বাসে আগুন দিলেই সরকার পড়ে যাবে। অত সহজ না। এটাই আমি বলতে চাই।’
আমেরিকাকে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘২০০১ সাল, নির্বাচন। আমাদের ক্ষমতায় আসতে দিল না। কেন দিল না, দিল না এ কারণে বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস, ওই আমেরিকা প্রস্তাব করল গ্যাস বিক্রি করতে হবে। কারণ আমেরিকার কোম্পানিরা এখানে উত্তোলন করে। আমি বলেছিলাম গ্যাস বেচব না।’
তিনি বলেন, ‘এ গ্যাস আমার জনগণের, এ গ্যাস জনগণের কাজেই ব্যবহার হবে। আমি বিদ্যুৎ দেব, সারকারখানা করব, পেট্রোকেমিক্যাল করব। জনগণের কল্যাণে ব্যয় করে ৫০ বছরের রিজার্ভ রেখে যদি অতিরিক্ত থাকে তাহলে দেব। তারা খুব নাখোশ হলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে ক্ষমতায় আসতে দেবেন না। তার সঙ্গে আমাদের দেশেরও কিছু লোক ছিল।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘২০০১ সালে ক্ষমতায় আসল বিএনপি-জামায়াত জোট। যে বিএনপি ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের ভোট চুরি করেছিল। ভোট চুরির অপরাধে দেশের মানুষ আন্দোলন করে খালেদা জিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। সেই ক্ষমতাচ্যুত ভোট চোর, জনগণের সম্পদ চোর বিএনপিকে আবার ক্ষমতায় বসাল ভোট কারচুপির মধ্য দিয়ে। গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়েছিল খালেদা জিয়া যে সে ক্ষমতায় এসে গ্যাস বেচবে। সেজন্য তার পিঠে বাহবা দিয়ে তাকে ক্ষমতায় বসাল। ফলাফল কী? জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দুঃশাসন। আমি বলেছিলাম খালেদা জিয়া গ্যাস দিতে পারবে না। কারণ গ্যাস পাবেই না। আসলে পায়নি, দিতে পারেনি।’
বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যে কূপ খনন করে খালেদা জিয়ার আমলে গ্যাস পাওয়া যায়নি, সেই একই কূপ খনন করে আওয়ামী লীগের আমলে শুধু গ্যাস না, এবার তেলও পেয়েছি। আল্লাহ যখন কাউকে কিছু দেয় তখন জন বুঝেই ধন দেন। আল্লাহ জানে ওদের কাছে দিলে সব নয়-ছয় করবে, আর আওয়ামী লীগের হাতে পড়লে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগবে।’
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে জনগণের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আগামীতে নির্বাচন। নৌকা আমাদের মার্কা। এ নৌকা নূহ নবীর নৌকা। এ নৌকায় মানবজাতিকে রক্ষা করেছিলেন রাব্বুল আলামিন। এ নৌকায় ভোট দিয়ে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা পেয়েছে। এ নৌকা যখন সরকারে এসেছে তখন বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি হয়েছে। আজকে তাই আপনাদের কাছে আমার আহ্বান, আমরা যাদের প্রার্থিতা দিয়েছি তাদের নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন—এটাই আমার আহ্বান। আপনারা দেবেন, বলেন হাত তুলে ওয়াদা করেন।’
এ সময় উপস্থিত জনতা দুই হাত উঁচিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি। দেশের মানুষ বারবার নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে পেরেছে বলেই আমরা এটা করতে পেরেছি। আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।’
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু করেছি। যেহেতু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে স্যাংশনে পড়ে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। যদিও আমরা তা অনেক কমিয়ে এনেছি। তার পরও আমরা পারিবারিক কার্ড করে দিচ্ছি যাতে মানুষের খাদ্যের কষ্ট না হয়। ইনশা আল্লাহ খাদ্যের কষ্ট কখনো হবে না, কারণ আমরা খাদ্যের উৎপাদন বাড়িয়েছি।’
সিলেট অঞ্চলে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সিলেটবাসী সবসময় আমাদের পাশে আছে। আমরা সিলেটে যত উন্নয়ন করেছি, জানি না সিলেটবাসী সেটা মাথায় রাখবেন কিনা!’
এ সময় তিনি সিলেটে মেট্রোরেল স্থাপনের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক যোগাযোগ এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনে নৌকার প্রার্থী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা জেবুন্নেসা হক, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সিলেট-৬ আসনের নৌকার প্রার্থী ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী ও অভিনেত্রী তারিন জাহানসহ সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতারা।
এর আগে জনসভায় যোগ দিতে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সিলেটে পৌঁছার পর হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার জিয়ারত করার পর শাহ পরানের (রহ.) মাজার জিয়ারত শেষে সিলেট সার্কিট হাউজে মধ্যাহ্নভোজ ও বিশ্রাম নেন। এরপর তিনি জনসভা মঞ্চে যান।
সিলেট থেকেই আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করলেন শেখ হাসিনা। আগামী ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তিনি বরিশাল, গোপালগঞ্জ জেলা সফর করবেন। এছাড়া বেশ কয়েকটি জেলায় ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেবেন তিনি।
আজ বেলা ৩টায় রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় ও লালমনিরহাট, রাজশাহী বিভাগের নাটোর ও পাবনা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের খাগড়াছড়িতে ভার্চুয়ালি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।
এছাড়া ২৯ ডিসেম্বর বরিশাল সফরে যাবেন তিনি। এদিন বেলা ৩টায় বরিশাল জেলা সদরে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর আগামী ৩০ ডিসেম্বর তার গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলায় সফরের কথা রয়েছে।










