চার দশকেরও বেশি সময় আগে চালু হওয়া সরকারি মালিকানাধীন পাঁচ তারকা হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল কারওয়ান বাজারে অবস্থিত এ সেবা কেন্দ্র টানা কয়েক বছর লোকসানের পর গত বছর মুনাফায় ফিরেছে। যদিও হোটেলটির মূল ব্যবসা রুম ভাড়ায় হচ্ছে না প্রত্যাশিত আয়। বরং মোট আয়ের বড় অংশই আসছে খাবার ও পানীয় বিক্রি থেকে।

প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও ঢাকা পরিচালিত হয় সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের অধীনে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, ওই বছর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের আয় হয়েছে প্রায় ১২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮১ কোটি টাকা এসেছে খাবার ও পানীয় বিক্রি থেকে, যা হোটেলটির মোট আয়ের ৬৬ শতাংশ। এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে হোটেলটির মূল ব্যবসা রুম ভাড়া থেকে ২০২৫ সালে আয় হয়েছে ৩৩ কোটি টাকার মতো। এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ খাবার ও পানীয় বিক্রির তুলনায় রুম ভাড়া থেকে আয়ের পরিমাণ কম হলেও এ ব্যবসায় হোটেলটির মুনাফার মার্জিন তুলনামূলক বেশি।

২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর মুনাফা করে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও। এর মধ্যে ২০১৮ সালে গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫৫ কোটি টাকা আয় এবং ৩৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল হোটেলটি। তবে কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর লোকসান গুনতে হয়েছে। ২০২৩ সালে মুনাফায় ফিরলেও ২০২৪ সালে আবার লোকসানে পড়ে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে হোটেলটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রুম ভাড়া থেকে আয় কমে যাওয়ায় খাবার ও পানীয় ব্যবসাই বর্তমানে হোটেলটির টিকে থাকার প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুম ব্যবসায় অবকাঠামো তৈরিতে একবার বড় বিনিয়োগের পর পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম। অতিথি এলে মূলত বেডশিট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবর্তন করেই আয় করা যায়। কিন্তু অতিথি কমে যাওয়ায় এ খাতের আয়ও কমেছে।

2

এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে সামনে কানেক্টিভিটি বাড়বে এবং রুম ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ মাহিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণত পাঁচ তারকা হোটেলের মূল ব্যবসা হচ্ছে রুম। মোট আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ এ খাত থেকে এবং রেস্টুরেন্ট বা ফুড অ্যান্ড বেভারেজে (এফঅ্যান্ডবি) বাকি ৩০ শতাংশ আয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে সোনারগাঁওয়ের চিত্রটি উল্টো। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছে এফঅ্যান্ডবি থেকে, আর রুম থেকে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশ।’

রুমের গ্রাহক কমে যাওয়ায় এমনটি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘হোটেলটির অবস্থান বিমানবন্দর থেকে কিছুটা দূরে। একই সঙ্গে শহরের কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যানজটও একটি সমস্যা। ফলে রুমের অতিথি তুলনামূলক কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে অবস্থানের কারণে সরকারি বিভিন্ন বড় অনুষ্ঠান ও প্রোগ্রাম পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠান, সেমিনারসহ বড় আয়োজনের বেশির ভাগই হোটেলটি পাচ্ছে। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রুম ব্যবসার ঘাটতি কিছুটা পূরণ হচ্ছে।’

অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম-দুর্নীতিও প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের লোকসানের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে হোটেলটির গ্রস অপারেটিং প্রফিট (জিওপি) ছিল মাত্র ৮১ লাখ টাকা। অর্থাৎ ওই সময়ে মোট আয়ের প্রায় ৯৯ শতাংশই ব্যয় হয়ে যাচ্ছিল।

এরপর হোটেল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্রয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনে। একই সঙ্গে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে উদ্যোগ নেয়া হয়। এতে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে হোটেলটির জিওপি বেড়ে প্রায় ১৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনৈতিক ধীরগতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিদেশী অতিথি ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধির আগমন হ্রাস এবং বড় করপোরেট আয়োজন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পাঁচ তারকা হোটেলের আবাসন ও ভেন্যু—দুই খাতের আয়েই। সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কে পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর পিক সিজন ধরা হয়। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ী ও পর্যটকের আগমন তুলনামূলক বেশি থাকে। এ সময় চাহিদা বাড়ায় অনেক হোটেলে কক্ষ খালি পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে দুই বছর ধরে পরিস্থিতি ভিন্ন। বিলাসবহুল এসব হোটেলে চাহিদা কমায় পরিচালন ব্যয় তুলতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

হোটেল পরিচালনায় ২০২০ সাল থেকে লোকসান গুনে আসছে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও। ব্যবসায় যে লোকসান হয়, তা এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট) থেকে পাওয়া সুদ আয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে এফডিআর থেকে সুদ বাবদ ৩০ কোটি টাকারও বেশি আয় হয় হোটেলটির। তবে পরিচালন ব্যয় ও হোটেলের লোকসান সমন্বয় করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত এর বড় অংশই ব্যয় হয়ে যায়।

দেশের প্রথম পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা। ১৯৬৬ সালে এটি ‘ইন্টার-কন্টিনেন্টাল ঢাকা’ নামে চালু হয়। তবে স্বাধীনতার পর দেশে বিভিন্ন শ্রেণীর বিশিষ্ট ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও বিদেশী প্রতিনিধিদের আগমন বাড়তে থাকে। বিদেশী অতিথিদের ক্রমবর্ধমান আবাসন চাহিদা পূরণে আরো একটি উন্নতমানের পাঁচ তারকা হোটেল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ঢাকায় তা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনকে (বিপিসি)।

পরবর্তী সময়ে সরকার হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি গঠন করে। কোম্পানিটি ১৯৭৭ সালের ২৫ জুন কোম্পানি আইনের অধীনে যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

জাপান সরকারের ওভারসিজ কো-অপারেশন ইকোনমিক ফান্ড থেকে নেয়া ৫৮ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের দেয়া ২৪ কোটি টাকার ঋণ—মোট ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৭৭ সালে হোটেলটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৮১ সালে। একই বছরের এপ্রিল থেকে প্যান প্যাসিফিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, সিঙ্গাপুর এবং হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মধ্যে সম্পাদিত পরিচালন চুক্তির আওতায় হোটেলটি পরিচালিত হয়ে আসছে।