ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হলো গণভোট। দেশের ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো অনুষ্ঠিত এ গণভোটে উৎসবমুখর পরিবেশে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ অংশ নিয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট যেমন পড়েছে, একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যায় ‘না’ ভোটও পড়েছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রাত ২টা) গণভোটের সমন্বিত ফলাফল নির্বাচন কমিশন থেকে জানা সম্ভব হয়নি।

তবে নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, কেন্দ্রভিত্তিক ভোট পর্যালোচনায় ‘হ্যাঁ’ ভোট এগিয়ে আছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা এখনই সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

দেশের বিভিন্ন সংসদীয় আসনভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ভোটারদের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। আর ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলা, চট্টগ্রাম বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ ও সিলেট বিভাগে ‘না’ ভোটের কিছুটা আধিক্য ছিল। সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা যেসব আসনে বিজয়ী হয়েছেন, সেখানে ‘না’ ভোটের হার ছিল বেশি। আর যেসব আসনে জামায়াত ও এনসিপি মনোনীত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন, সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট কিছুটা বেশি পড়েছে।

যেমন রাজধানীর রামপুরা আইডিয়াল স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন তরুণ ভোটার আরিফুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার সংস্কারে গণভোটে “‍হ্যাঁ” দিতে এসেছি। ২০১৭ সালে ভোটার হলেও কখনো ভোট দিতে পারিনি। এবার শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের ভোটে নির্বাচিতরা যাতে দেশটাকে দুর্নীতিমুক্ত করে উন্নয়নর পথে এগিয়ে নেয়, সেটিই প্রত্যাশা।’

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল (দাঁড়িপাল্লা) ২ লাখ ১১ হাজার ৪১ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। ওই আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪। বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে ৮১ হাজার ২৫।

ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৯৪ হাজার ৬০৫টি। ‘না’ ভোট পড়েছে ২৭ হাজার ৪৯৭টি। ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৫১ হাজার ৮৭৫টি। ‘না’ ভোট পড়েছে ২৫ হাজার ৪০১টি।

অবশ্য এক্ষেত্রে একেবারেই বিপরীত চিত্র দেখা গেছে খাগড়াছড়িতে। সেখানে ২০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪১টি কেন্দ্রের ফলাফল পাওয়া গেছে। তাতে ‘হ্যাঁ’ পিছিয়ে আছে। ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে ৩০ হাজার ৬৬৫ ভোট এবং ‘না’ পেয়েছে ৩১ হাজার ৭৬ ভোট।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ গণভোট হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর ভিত্তি করে। এ সনদে সংবিধান সংস্কার নিয়ে ৪৮টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের আলোকে গণভোটে চারটি বিষয়ের ওপর একটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট নেয়া হচ্ছে। বিষয়গুলো হলো প্রথমত, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় গঠন করা হবে। দ্বিতীয়ত, আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। তৃতীয়ত, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণসহ জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে গৃহীত ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। চতুর্থত, জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।