আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ও পোকামাকড়ের তেমন আক্রমণ না থাকায় চলতি মৌসুমে দিনাজপুরের হিলিতে বোরো ধানের ভালো ফলন হয়েছে। তবে ধানের ভালো ফলন হলেও কৃষকের সেই খুশি মলিন হয়ে গেছে বাজারে দাম না পাওয়ায়। সপ্তাহের ব্যবধানে ধানের দাম মণপ্রতি ৩০০-৩৫০ টাকা কমে গেছে। এমনকি অনেকেই কিছু জাতের ধান কিনতে চাচ্ছেন না। এতে ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষীরা।
হিলির বিভিন্ন ধানের আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, ভালো মানের শম্পা কাটারি জাতের ধান বর্তমানে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ দাম উঠেছিল। এছাড়া কিছুটা মান খারাপ ও ভেজা এমন শম্পা কাটারি জাতের ধান ৯২০-৯৫০ টাকা মণদরে কেনাবেচা চলছে। এছাড়া জিরা (মিনিকেট) জাতের ধান ১ হাজার ২০০ ১ হাজার ২২০ টাকা মণদরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণদরে বেচাকেনা হয়েছিল। এছাড়া ২৯ জাতের ধান ৯০০-১০০ টাকা মণদরে কেনাবেচা চলছে।
হিলির দক্ষিণ বাসুদেবপুরের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য ধানের চেয়ে ফলন কিছুটা বেশি হওয়ায় কয়েক বছর ধরেই শম্পা কাটারি জাতের ধান আবাদ করে আসছি আমরা। আমার মতো এলাকার অনেক কৃষক এ জাতের ধান চাষাবাদ করে আসছেন। এবার আবহাওয়া অনুকূল থাকায় রোগবালাইয়ের তেমন আক্রমণ হয়নি। এতে ধানের ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু তার পরেও আমরা খুশি হতে পারছি না। কারণ বাজারে এ জাতের ধানের দাম কম। প্রথমদিকে এ জাতের ধানের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ উঠেছিল। সেই ধান এখন দাম কমতে কমতে ১ হাজার ১০০ টাকায় নেমে গেছে, যা কিনা সবচেয়ে ভালো মানের শুকনো ধান। কিছু ধান সামান্য ভেজা থাকলে ৯৫০ টাকা মণদরে বেচাকেনা চলছে। এমনকি এ ধান কেউ নিতেই চাচ্ছেন না। নিতে চাইলেও দাম কম বলছেন, আবার বাকিতে কিনতে চাইছেন। বিভিন্ন আড়তদারের কাছে ঘুরেও কেউ ধান নিতে চাইছে না। এ কারণে এবার এ জাতের ধান আবাদ করে বিপদে পড়ে গেছি।’
আড়তে ধান বিক্রি করতে আসা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি গুদামে ধান দিতে নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। যেমন ধান শুকনো থাকার শর্তসহ নানা ঝামেলার কারণে আমরা আড়তদারদের কাছে ধান বিক্রি করি। কিন্তু বর্তমানে সরকারি গুদামের সেই ঝামেলা আড়তদাররা শুরু করেছেন এ শম্পা কাটারি জাতের ধান নিয়ে। ধানের দাম ৯২০-৯৫০ টাকা মণ বলছেন। এ দামে ধান বিক্রি করলে আমাদের লোকশান ছাড়া লাভের মুখ দেখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই বাধ্য হয়ে এখন ধান শুকিয়ে বস্তাভরে রেখে দিচ্ছি। যখন দাম বাড়বে তখন বিক্রি করব।’
হিলির ছাতনী গ্রামের বর্গাচাষী জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘অন্যান্যবারের চেয়ে এবার ধান আবাদ করতে খরচ বেশি হয়েছে। ধান কাটা-মাড়াইয়ে খরচ বিঘাপ্রতি এক-দেড় হাজার টাকা বেশি লাগছে। বর্তমানে ধান বিক্রি করে খরচের টাকাই উঠছে না, লাভ করা তো দূরের কথা। ফলে আমরা যারা মানুষের জমি লিজ নিয়ে ধান আবাদ করেছিলাম তাদের খুব সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’
হিলির হরিহরপুরের ধানের আড়তদার মুশপিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা স্থানীয় বাজার থেকে ধান কিনে চালকলে সরবরাহ করি। কিন্তু কয়েকদিন ধরে মিলগুলোয় ধানের তেমন চাহিদা নেই। এর কারণ বর্তমানে যে দাম দিয়ে তারা বাজার থেকে ধান কিনছেন সে অনুযায়ী চালের দাম নেই। এমনকি চালের তেমন ক্রেতাও নেই। লোকসান হওয়ার কারণে মিলাররা ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। তাই চাহিদার তুলনায় বাজারে ধানের সরবরাহ বাড়ায় দাম কমছে।’
হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৭ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭ হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় কৃষক ধানের ভালো ফলন পাচ্ছেন।










